ইউএনও নাহিদা বারিকের বক্তব্য ও না.গঞ্জের সাংবাদিকতা

0

আনোয়ার হাসান: অনেক সিনিয়র সাংবাদিকের কাছে ‘পেশাদার’ শব্দটা অনেকবার শুনেছি। এর মানে বলতে তারা বুঝাতে চেয়েছেন, সব বাদ দিয়ে দিনভর সংবাদের পেছনে ছুটা। বড়দের এই কথা অনেকে মানে আবার অনেকে এড়িয়ে চলে। যারা এড়িয়ে চলে তাদের কথা হলো, সংসার চালাতে অনেক খরচ হয়। সংবাদপত্র অফিস থেকে সে পরিমাণ বেতন দেয়া হয় না। কেউ কেউ জানান, নারায়ণগঞ্জের অনেক পত্রিকা না-কি সাংবাদিকদের বেতনই দেন না। আর সবচেয়ে বেশী ঠকানো হয় ফটো সাংবাদিকদের !

তবে কিছু দিন ধরে এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। কিভাবে হলো, কেন হলো তার বিস্তারিত পরে আলোচনা করছি। এর আগে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা বারিক এর একটি বক্তব্য প্রসঙ্গে আলোকপাত করি। ১৫ জুলাই দৈনিক যায় যায় দিন এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে চাষাঢ়ায় একটি অনুষ্ঠানে নাহিদা বারিক বলেন, সাংবাদিকরা যেন সাংবাদিকতার পাশাপাশি ব্যবসা কিংবা উপার্জনের জন্য ভালো কিছু করেন। সাংবাদিকরা যদি আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকেন তাহলে তাদের মেধা কাজে লাগাতে সুবিধা হয়। নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিকরা মনের দিক দিয়ে অনেক ভালো বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ইউএনও নাহিদা বারিকের এ বক্তব্য আমার ভালো লেগেছে। আমিও মনে করি সাংবাদিকতার পাশাপাশি অন্য আয় না থাকলে সমস্যায় পড়তে হয়।

নারায়ণগঞ্জে অনেক পত্রিকা। তবে সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা দেন এমন পত্রিকার সংখ্যা খুব কম। অপরদিকে সাংবাদিকের সংখ্যাও অনেক তবে লেখতে পারেন এমন সংখ্যা বেশী নেই। বিভিন্ন পত্রিকা অফিসগুলোকে এজন্য হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যায়। তবে বেশী বেতনে যোগ্যতা সম্পন্ন সাংবাদিক নিয়োগ দিতেও রাজি নন তারা। আর এ কারনেই এই হতাশা থেকেই যাবে।

অনেক সময় আত্মপক্ষ সমর্থন করে কয়েকজন পত্রিকা মালিক বলেছেন, বিজ্ঞাপনের বাজার তেমন নেই। আয় কম তাই বেশী বেতন-ভাতা দিতে পারি না। প্রশ্ন হলো, আপনার যদি আয় নাই থাকে তবে প্রকাশক হওয়ার দরকার কি মশাই ?

এবার আসি ফটো সাংবাদিকদের বেতনের বিষয়ে। নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ পত্রিকায় ফটো সাংবাদিকদের বেতন দেয়া হয় না বলে আক্ষেপ করে ফটো সাংবাদিকরা। একজন সিনিয়র ফটো সাংবাদিক আমাকে প্রায়ই বলেন, বেতন দিতে পারে না বলেই যাকে খুশী তার হাতেই ফটো সাংবাদিকের পরিচয়পত্র তুলে দেয় পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদকরা। প্রশ্ন হলো, সারা দিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যারা ছবি তোলার মতো কষ্টের কাজটি করেন তাদের মাগনা খাটানোর এই প্রথা কবে শেষ হবে ? আর যারা ফটো সাংবাদিকতায় যুক্ত তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, বেতন না নিয়ে কাজ করা বুদ্ধিমানের বৈশিষ্ট্য নয়।

তবে বেশ কিছু দিন যাবত অনলাইন গণমাধ্যম শুরু হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জে সংবাদকর্মীদের বেতন-ভাতার একটা নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে। কয়েকটি অনলাইন কর্মীদের মোটা অংকের বেতনও দেয়। ইদানিং কয়েকটি পত্রিকাও তাদের কর্মীদের বেতন-ভাতা দিচ্ছে নিয়মিত। তাদের নিয়ে কোন কথা নই তবে যারা দিচ্ছে না তাদের বলবো, মানসিকতা বদলান। নয়তো বাজার হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জে দুই-একটি পত্রিকা এর উদাহরণ হিসেবে এখনও টিকে আছে। একসময় যারা এক নম্বর, দুই নম্বরে ছিলো এখন তাদের পত্রিকার কাটতি একেবারেই কম। আবার এখন যারা উপরের দিকে আছেন তাদের বলবো, টিকে থাকতে হলো কর্মপন্থা-কৌশল নিত্য নুতন বের করতে হবে। আর তা করতে মেধাবীদেরকে দায়িত্ব দিতে হবে।

শেষ করছি, ইউএনও নাহিদা বারিকের সেই বক্তব্য প্রসঙ্গে। সাংবাদিকদের আয় ও স্বচ্ছল জীবন যাপনের বিষয়ে তিনি যা বলেছেন তা পুরোপুরি সত্য। কারণ অভাব মানুষের মেধাকে অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। তাই সাংবাদিকরা এই পেশার পাশাপাশি ভালো পথে অন্য আয়ের ব্যবস্থা করলে আসলেই কাজ করতে সুবিধা হয়। তবে কিছু সিনিয়র সাংবাদিক আবার অনেক সাংবাদিকের অনেক আয়ের ব্যবস্থা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে। ‘ও সাংবাদিক ওই ব্যবসা করে, ও সাংবাদিকতো দোকানদার, ও সাংবাদিকের টেম্পো আছে’ এসব কথা বলে। কতিপয় সম্পাদকও এমন বলে থাকেন। তাদের বলবো, নিয়ম মেনে ব্যবসার করলে মন্দ না। বরং সাত খুনের মাস্টারমাইন্ড নূর হোসেনের মতো লোকদের সাথে সখ্য রেখে গাড়ি হাঁকানো, দামী ফ্ল্যাট কেনার চেয়ে তা ভালো।

(বি.দ্র. : বেতন নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিযোগ নেই। আমি একটি পত্রিকা ও একটি অনলাইনে কাজ করে জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ বেতন পাই )

(লেখক : বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সংবাদচর্চা। বিশেষ প্রতিনিধি, লাইভ নারায়ণগঞ্জ ডট কম)

0