‘ঈদ হোক সর্বজনীন উৎসব’

0

ঈদ উৎসব ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলের অনাবিল আনন্দ খুশির দিন। প্রতি বছর ঈদে কেনাকাটা থেকে শুরু করে নানা রকম প্রস্তুতি থাকে তুঙ্গে। এবছর প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঈদের সেই চিরচেনা আমেজ পাল্টে দিয়েছে। বৈশ্বিক মহামারি করোনা বিস্তার রোধে সড়কে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে আবার প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ অবস্থান পরিবর্তনে রয়েছে সরকারি নিষেধাজ্ঞা। পরিস্থিতিগত কারণে কারো বাড়ি ফেরা হচ্ছে না। বাস, লঞ্চ কিংবা ট্রেনের চাঁদে দেখা যাচ্ছে না যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। এবারের দৃশ্যপট পুরো উল্টো তবে সড়কে চলছে প্রাইভেট গাড়ি ধনীরা অনেকেই যাচ্ছে বাড়ি এক দেশে দুই রকম নিয়ম-নীতি। দেশের বিভিন্ন শহর বন্দর ও শিল্প এলাকায় অবস্থানরত লাখো কোটি শ্রমজীবি মানুষ ঈদ উপলক্ষে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরে। এসব মানুষ কাজকর্ম করে যা আয় রোজগার করে তা দিয়ে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে ঠিকঠাক চলতে পারে না।

সারা বছর নানা সংকটে ধারদেনা করে চলে। ফলে তাদের গ্রামের বাড়ি যাওয়ার আর্থিক সামর্থ্য বা সুযোগ কোনটা’ই থাকেনা। ঈদ উপলক্ষে উৎসব বোনাস ও বকেয়া বেতন-ভাতা সহ কিছু বাড়তি টাকা এক সাথে পাওয়ার সুবাধে তারা ঘর মুখো হয়। আপনজনদের সহিত মিলিত হয়ে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করে উপভোগ করার জন্য। তাই ঈদকে কেন্দ্র করে সবাই বাড়ি ফিরে। এবার করোনা বিপর্যয়ের কারণে ঈদ-উল ফিতরের ঈদে তাদের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার সুযোগ নেই। গরিব মানুষ গুলোর জীবনে এমনিতেই দুঃখ কষ্ট ও দুর্ভোগের কোন শেষ নেই আবার উৎসব পার্বণে তা শতগুণ বেড়ে সীমাহীন বেদনায় পরিণত হয়। আকাশে ঈদের চাঁদ উদয় হলেও গরিব মানুষের জীবনে তা খুশি হয়ে ধরা দেয়না। শুধু চাঁদ দেখাতেই আটকে থাকে গরিব মানুষের খুশির রঙ। চলমান দুর্যোগ পরিস্থিতির মধ্যে ঈদ উপলক্ষে নতুন কাপড় কেনা তো দুরের কথা কারো কারো পক্ষে এক পেকেট সেমাই ও চিনির ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে না।

ঈদ মানে আনন্দ খুশি অথচ দেশের বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থায় ঈদ হয়ে উঠেছে ধনীদের অতিরিক্ত বিলাস আর গরিব মানুষের দীর্ঘ শ্বাস ও বাড়তি বিড়ম্বনা। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ গরিব অসহায় দারিদ্র এবং অনেকে দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে তাদের ঈদ উৎসবের দিন আর সাধারণ দিনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। করোনা দুর্যোগের মধ্যে শ্রমজীবি গরিব মানুষের জীবনে ঈদের আনন্দ খুশির ছুঁয়া লাগবে বলে মনে হয় না। প্রতি বছরই গরিব মানুষ গুলো বারোমাস নানা সংকটে তলিয়ে থাকে। ঈদকে কেন্দ্র করে উৎসব পালনে তাদের অসহায়ত্ব ঈদের আনন্দ খুশিকে নিরানন্দ ও যন্ত্রনায় পরিণত করে। তারপরও ঈদ উপলক্ষে আপনজনদের সাথে মিলিত হওয়ার একটা আনন্দ ছিলো সেটাও হবে না।

ধর্ম ও মানবতার শিক্ষা মানুষে মানুষে বৈষম্য ঘুচিয়ে সবাইকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আহবান জানালেও বাস্তবিক অর্থে আজও আমাদের সমাজে তা হয়ে উঠেনি। সমাজে বিরাজমান এই বৈষম্য দূর হোক। বিত্তবানদের অনেকেই প্রতি বছর যাকাত হিসেবে দুস্থদের মাঝে শাড়ি-লুঙ্গী দান করে থাকে। সে গুলো না দিয়ে যারা দিন আনে দিন খায়, নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাদের হাতে টাকা দিয়ে দিলে অন্তত দু বেলা পেট পুরে তারা খেতে পাড়বে। চলমান দুর্যোগ পরিস্থিতিতে মানুষের কাপড়ের চেয়ে খাদ্যের বেশি দরকার। এই দুঃসময়ে সকল কে একটু মানবিক হয়ে অসহায় দারিদ্র মানুষ গুলোর দিকে সাহায্য সহযোগিতার হাতটা বাড়িয়ে দিতে হবে। করুণা নয় ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকাতে হবে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমাদের সমাজে অনেক সম্পদশালী লোক ঈদ উদযাপনে প্রচুর অর্থ খরচ করে তাদের প্রতি আবেদন। নিজের খরচের কিছু অংশ বাঁচিয়ে আপনার চারপাশের দারিদ্র অসহায় মানুষ গুলোকে দেন। ক্ষুধার্ত মানুষ গুলোর মুখে ঈদের দিন আনন্দ খুশি ফুটে উঠলে তবে’ই ঈদের উদ্দেশ্য স্বার্থক হবে।

লেখক: এম এ শাহীন
সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

0