‘এত কান্নার শব্দ তবুও কাউকেই যে পাশে পাওয়া গেলোনা’

0

লাশটা জড়িয়ে গগনবিদারী চিৎকার করে কাঁদতে থাকে রোজিনা। ২ বছর ৩ মাস বয়সী ইয়ানুর মধ্য রাতে মায়ের এমন কান্না দেখে ভয় পেয়ে যায় খুব। ১২ বছর বয়সের বড় ছেলে রবিউল কি করতে হবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। সদ্য মৃত বাবার পা জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে সেও। বাবা বাবা করে ডাকতে ডাকতে নিঃশেষ হয়ে যায় শরীরের সমস্ত শক্তি। কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, তার বাবা আজ আর সাড়া দেয় না কিছুতেই! তার বাবা যে আর পৃথিবীতে নেই!!

অনেক অনেকক্ষন পর মুয়াজ্জিনের সুমধুর কন্ঠে রোজিনার কানে ভেসে আসে ফজরের আযান। চোখ খুলতেই সেই বিভিষীকাময় দৃশ্য, মৃত স্বামীকে জড়িয়ে পড়ে আছেন তিনি। কথা বলার সমস্ত শক্তি কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে। রবিউল কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বাবার পায়ে জানতেও পারেনি। ছোট্ট ইয়ানুর পড়ে আছে মেঝেতে! এত কান্নার শব্দ তবুও কাউকেই যে আজ পাশে পাওয়া গেলোনা। এখন কি করবে রোজিনা? ৩২ বছর বয়সে এমন দূর্বিষহ রাত তার জীবনে কখনো আসেনি আর। সূদুর গাইবান্ধা থেকে জীবিকার প্রয়োজনে স্বামীর সিকিউরিটি গার্ডের চাকুরীসূত্রে এই সোনারগাঁয়ের গোহাট্টা’য় আসা তাদের। এই শহরের একটি মানুষও যে তার পরিচিত নয়!

কারা যেনো খবর দিয়েছে প্রশাসন, পুলিশে। সকাল হতেই কয়েকজন ডাক্তার এসে সেম্পল নিয়ে গেলো। কয়েকজন এসে বললো আমাদেরকে প্রশাসন থেকে ইউএনও সাহেব পাঠিয়েছেন, আমরা উনার লাশ শরিয়ত মতে দাফন করতে চাই। আপনার সম্মতি চাচ্ছি। হঠাৎ ওজনশুন্য হয়ে গেলো রোজিনা। লাশটা দোতলা থেকে নামিয়ে নিয়ে গেলো ওরা। বারান্দায় গিয়ে প্রিয় স্বামীর চলে যাবার শেষ দৃশ্যটা একবার দেখতে ইচ্ছে করছিলো খুব কিন্তু শক্তি হারিয়ে ফেললেন তিনি । বাচ্চা দুটো চিৎকার করে কেঁদেই যাচ্ছে তবুও ঘর জুড়ে যেনো এক দূর্বিষহ শুন্যতা। লাশটা পড়েছিলো তবুও তো ছিলো মানুষটা! এখন একা এই ছোট্ট শিশুদুটি নিয়ে কোথায় যাবে? কিভাবে যাবে? কি করবে রোজিনা!!

আমাদের এই রংমাখা শহরেও অথৈ সাগরে ভাসতে থাকা রোজিনার পাশে এসে দাঁড়ায় আল মামুন ও তার পত্নী । উপজেলা প্রশাসনের, আপনাদের সহকারী কমিশনার ভূমি (এসিল্যান্ড) আল মামুন।

অথৈজলে ডুবে যাওয়া মানুষকে যত্ন করে হাত ধরে তুলতে পারে না সবাই। তুমি পেরেছো। তোমাকে হাজার সালাম প্রিয় মামুন । তুমি হয়ত পুরো পৃথিবীর দায়িত্ব নিতে পারবে না, কিন্তু দু’একটি মানুষের দায়িত্ব তুমি নিশ্চয়ই নিতে পারবে। তুমি সেটাই করেছো। তোমাকে স্যালুট।
নিন্দুকদের কথা ভেবোনা ওরা তো মানুষের মহৎ কাজকে ভালো বলতেও কৃপণতা আর কুন্ঠাবোধ করে। এগিয়ে যাও, জ্বলে উঠো স্বমহিমায়।
ভূপেন হাজারিকার সুরে সুরে গেয়ে উঠো…

“বল কি তোমার ক্ষতি-
জীবনের অথৈনদী…
পার হয় তোমাকে ধরে-
দূর্বল মানুষ যদি…”

[ এটি কোন গল্প নয়, সোনারগাঁয়ে ১৯ এপ্রিল রাত দুটোয় করোনা ভাইরাসে মৃত আব্দুর রহিমের স্ত্রী রোজিনার বাস্তবতা ]

লেখাটি উপজেলা প্রশাসন, সোনারগাঁ থেকে নেওয়া।

0