এসপি হারুন যে কারণে না.গঞ্জে আলোচিত-সমালোচিত

0

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: একাদশ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ২৮ দিন আগে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেন হারুন অর রশিদ। প্রায় ১১মাস দায়িত্ব পালনের পর রোববার (৩ নভেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বদলি করে তাকে পুলিশ অধিদফতরে পুলিশ সুপার (টিআর) পদে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এসপি হারুন নারায়ণগঞ্জে যোগদান করার পূর্ব থেকেই সারা দেশেই পরিচিত। বেশ আলোচিত-সমালোচিত এ পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে তাই এ জেলাবাসীর উৎসুক দৃষ্টি ছিল আগ্রহের কেন্দ্র বিন্দুতে।

জাতীয় নির্বাচনের পর পর শুরু হয় এসপি হারুনের কর্ম বিস্তৃতি। ঘোষনা দেন জেহাদের। মাদক, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যূতার বিরুদ্ধে । আশ্বাস দেন শান্তিপূর্ণ ও বাসযোগ্য নারায়ণগঞ্জ উপহার দেয়ার। সে অনুযায়ী শুরু হয় ‘এসপি হারুনের এ্যাকশেন’।

দারুণ নন্দিত হতে থাকেন প্রভাবশালী এ কর্মকর্তা। প্রসংশার ফুলঝুড়ির বন্যা বইতে থাকে। এসপি হারুন সাধারণের আস্থার প্রতিক হিসেবে ভিন্ন রূপে উদয় হতে থাকেন। তবে, শেষের দিকে এসে কয়েকটি অভিযান ও মামলা সংক্রান্ত ইস্যুতে বির্তকিত হতে থাকেন। কথিত আছে- নিয়োগ- বদলী বানিজ্য আর ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবির। এর ১১ মাসে এসপি হারুনকে মোকাবেলা করতে হয় প্রভাবশালী-ক্ষমাশীনদের রক্ত চক্ষুও। অপরদিকে সরকার দলীয় অনেকেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করে ক্ষোভ ঝাড়েন এসপির কর্মকান্ডের।

জেলায় এই ১১মাসের ফিরিস্তিতে ব্যপক প্রশংসিত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি ঘটনা তাকে বির্তকিত করলেও অনেকের মতে, এসপি হারুন নারায়ণগঞ্জে প্রচন্ড ঝাকুনি দিয়ে গেছেন ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে। আর এতোটা নন্দিত-নিন্দিত হতে পারেন নি এর আগে অন্য কোন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা।

আলোচিত হতে থাকেন ২০ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের পাগলা থেকে স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা মীর হোসেন মীরুকে গ্রেপ্তার করার মধ্য দিয়ে। তাকে মুক্ত করতে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের তদবির পাত্তা পায়নি। এর পর, একের পর এক গ্রেপ্তার আর অভিযান আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি করতে থাকে। মাদক, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যূতার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা শুরু করেন তিনি। এতে ছাড় পায়নি জনপ্রতিনিধিরাও।

ব্যপক আলোচনায় আসে হকার ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান। বেশ কছিুদিন নগরজুড়ে শান্তিতে চলাচল করতে পেরে সাধারনের দোয়া পেয়েছিলেন পুলিশ সুপার। ২০১৮ সালের ২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের এসপি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর পরপর তিনবারসহ সর্বমোট ৬ বারের মতো ঢাকা রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ এসপি নির্বাচিত হন তিনি।

রাস্তা দখলমুক্ত করা, প্রভাবশালীদের হাত থেকে ফ্ল্যাট মুক্ত করে প্রকৃত মালিকের কাছে হস্তান্তর, এতিমদের সম্পত্তি ও মিল-কারখানা ফিরিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজের জন্য প্রশংসিত হতে থাকেন। প্রতিদিনই সকালে এসপি অফিসে শত শত মানুষ তার কাছে দেখা করতে ভীড় জমিয়েছে। তুলে ধরেছেন ‘নির্যাতিত ও নিপিরীত হওয়ার গল্পও’।

৭ ফেব্রুয়ারি পাগলার শাহ আলম গাজী ওরফে টেনু গাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। যিনি নিজেকে একজন সংসদ সদস্যের বন্ধু পরিচয় দেন। নগরের ৫ নম্বর ঘাট এলাকা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি বিআইডব্লিউটিএ এলাকায় জুয়ার বোর্ডে অভিযান চালিয়ে ৪১ জুয়াড়িকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই ঘটনায় সাংবাদিক জড়িয়ে একটি ঘটনা সমালোচনা তৈরী হয়।

১৮ এপ্রিল দুপুরে পাইকপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ১৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু ওরফে ডিসবাবুকে। ২০ এপ্রিল ফতুল্লা থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে র‌্যাব, পুলিশের তালিকাভুক্ত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ‘মূর্তিমান আতঙ্ক’ মোফাজ্জল হোসেন চুন্নুসহ ২৩ জন গ্রেপ্তার হয়। ২২ এপ্রিল ও ২৩ এপ্রিল জেলায় ২৪ ঘন্টার মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হয় ২০ মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী।

গত ২৭ মার্চ ফতুল্লার জামতলা এলাকায় সাংসদ শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের স্ত্রী বড় ভাই জনৈক ভিকিসহ অন্যদের বিরুদ্দে সিঙ্গাপুর প্রবাসী আজিজুল গাফফার খানের জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগে মামলা। কিছু দিন পরে এক সিএনজি ড্রাইভারের ভাঙচুর মামলায় ভিকিকে গ্রেপ্তার। ১ এপ্রিল রাতে ফতুল্লার পাগলা এলাকায় অবস্থিত মেরি অ্যান্ডারশনে ভাসমান জাহাজে পুলিশের অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ ৬৮ জনকে গ্রেপ্তার। ওই ঘটনায় এমপি শামীম ওসমানের শ্যালকে জড়ানোর ঘটনায় ব্যবপক বির্তক হয়। ১ আগস্ট নবীগঞ্জ গুদারাঘাট এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সেক্রেটারি সাইফউদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধান ও তার ৪ সহযোগীকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এঘটনায় পুলিশের তথ্য ও পরিবারে তথ্যে ব্যপক ফারাক থাকায় বিভ্রাট তৈরী হয়

লাগাতার জেলা পুলশের বিশেষ অভিযান এসপি হারুনের ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জবাসীকে আশান্বিত করতে থাকে। গণমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই তার প্রসংশিত সংবাদ প্রকাশ হতে থাকে। দেয়া হতে থাকে নানা বিশেষন।

তবে, এসব কাজ করতে গিয়ে অদৃশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পরেন এসপি হারুন এক প্রভাবশালী এমপি ও তার অনুসারীদের সাথে।

অপর দিকে, বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তাদের অতি বাড়াবাড়ি ও নানা দূর্নীতি সবাই বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করেন। এর মধ্যেই কয়েকটি অভিযান, ব্যবসায়ীদের চায়ের দাওয়াত দিয়ে কিংবা আটকে রেখে, মামলা করে চাঁদা দাবির অভিযোগ এসপি হারুনের অজর্ন ম্লান করে দেয়। দীর্ঘ ১১ মাসে নারায়ণগঞ্জে নিজের যে ইমেজ তৈরী করেছিলেন, সাধারনের যেই আস্থার প্রতিক হয়েছিলেন তা যেন অতলে হারাতে থাকে।

১ অক্টোবর দিবাগত রাতে রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার রসুলপুর এলাকায় ব্যবসায়ীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ও ২ হাজার ইয়াবা বড়িসহ তিন ব্যক্তিকে আটকের ঘটনায় বেশ সমালোচনা সৃষ্টি হয় এসপি হারুনকে নিয়ে। ওই ব্যবসায়ীর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় তাদের ফাঁসানো হয়েছে।

এরপর ২ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের একটি কারখানায় অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সেখানে শত কোটি টাকার নকল ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রসাধনী সামগ্রী জব্দ করে বলে পুলিশ দাবি করেন। কিন্তু পরদিনই কারখানাটির মালিক দাবি করেন অভিযোগ মিথ্যে। তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।

সর্বশেষ ১ নভেম্বর পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ হাশেমের ছোট ছেলে শওকত আজিজ রাসেলের পুত্র ও স্ত্রীকে আটকের ঘটনায় ফের সমালোচনা সৃষ্টি হয় এসপি হারুনকে নিয়ে। এসপি হারুন তাদের আটকের পর দাবি করে ছিলেন ‘গভীর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় আটক করে গাড়িটি তল্লাশি করে মাদক ও গুলি উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এসময় রাসেলের পুত্র ও স্ত্রী গাড়িতেই ছিল। কিন্তু পরদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ পায় ‘যেখানে দেখা যায় রাসেলের পুত্র ও স্ত্রীকে ঢাকার বাড়ি থেকে তুলে আনা হচ্ছে।’
তার আগে সিনহা গ্রুপের মালিকদেরও আটকে হেনস্তা ও চাদা দাবির অভিযোগ উঠে।

আর ৩ অক্টোবর পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদকে বদলী আদেশ আসে।

এদিকে, এসপি হারুনের বদলীর আদেশের ২৪ঘন্টার মধ্যে নগরীর ফুটপাতসহ বদলে যেতে থাকে অনেক কিছু । যেন স্বরূপে ফিরছে নগর। এক অজানা অস্বস্তি থেকে যেন হালকা হচ্ছে ’তারা’।

0