করোনা ফাইটার খোরশেদের আবেগঘন ভিডি বার্তা

0

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: করোনা ভাইরাস মানুষ মানুষের সর্ম্পকের সত্য রূপটা তুলে ধরছে। আপন পর এর অন্যরকম সীকরণ সৃষ্টি করছে। সকল মায়া জালের উর্দ্ধে সতিকারের মনুষ্য রূপ প্রকাশ পাচ্ছে।

এই নগরীতেরই করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে কেউ মারা গেলে কিংবা কেউ আক্রান্ত হলে তাকে ভিন্ন চোখে দেখছেন বর্তমান সমাজের কিছু ভ্রান্ত মানুষ। এমন কি সেই মানুষ গুলো হাজারও আত্নার বন্ধনের, অতি নিকটের। অথচ এই করোনার কঠিন বাস্তবতায় সব মিছে!

যাদের নিয়ে স্বপ্ন হাজার, যাদের সাথে গড়ে তুলছেন স্বপ্ন, যাদের নিয়ে কাটেছে জীবনের সোনালী মূহুর্ত, সেই আপনার মৃত্যুর পর তারা ফিরেও তাকাচ্ছে না। আপনার স্ত্রী-সন্তানের কান্নাও এগিয়ে আনতে পারছে তাদের। এমনই এক অবস্থার সম্মুখীন বর্তমানে, সৃষ্টি হয়েছে মানবিক শঙ্কট। এরকমই এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাখসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ।

২৬এপ্রিল ওই ভিডিও বার্তায় কাউন্সিলর খোরশেদ জানান, আজ সকালেই একটি লাশ দাফনের সময়ই খবর পাই গলাচিপায় এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তারপরই ফোন পাই তার শ্যালকের, ভাই ফোন দেয়, আত্মীয় ফোন দেয়- ‘মনে হয় একজন মারা গেছে ডাক্তারের ব্যবস্থা করেন’।

তখন আমি তাদের, অনুরোধ করেছি তারা যেন নিজেরাই ব্যবস্থা করেন। কিন্তু তারা সাহস করে কেউ আসেনি। তারপর আমরা ওই বাড়িতে যাই। গিয়ে দেখি চারতলায় ভবনে বসবাস করেন তারা। আর ওই লোক তিন তলার মাঝামাঝি সিড়িতে লম্বালম্বি পরে আসেন মরে।

আমার আজকে এই বিশেষ বার্তাটি হচ্ছে- কোন হিন্দু-মুসলিম কোন ধর্ম নিয়ে নয়। মানবতা নিয়ে। মানুষের প্রতি আমাদের এই বার্তা। আজকে যে ভদ্রলোক মারা গেলেন, আমার জানা মতে তিনি একজন কোটিপতি মানুষ। তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের ৭জনের সাথে মিলে ৭তলা ভবন নির্মাণ করেছিলেন, তার বন্ধু এবং পার্টনারদের নিয়ে। একইসাথে তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

তার যে বন্ধুদের নিয়ে বিল্ডিং- ফ্ল্যাটে বাস করছেন, তার সেই বন্ধুগুলোও তার দুটি কিশোরী কন্যার (এখনও প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি) ডাকে সারা দেননি। অবশেষে তার দুই কিশোরী কন্যা এবং তার স্ত্রী চেষ্টা করেছিল তাকে নামিয়ে কোথাও নেওয়ার জন্য, এজন্য ৩তলা সিড়িতে পরে ছিলেন তিনি। তারপর সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে।

এ পর্যায় থেকে আমরা যে আহ্বানটি করবো- এই যে আপনারা যে প্রতিবেশীরা এবং আত্মীয় স্বজনরা সাড়া দিচ্ছেন না, এতে করে একটা মানবিক শঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। আজকে আমরা যেরকম মানুষ, আপনারাও সেরকম মানুষ, আমরা যদি পারি আপনারা কেন তাদের একটু সহায়তা করতে পারবেন না। একবার সেই কিশোরী মেয়ে দুটোর কথা চিন্তা করেন ওদের কি অবস্থা! তাদের বাবাকে তারা দীর্ঘক্ষণ এই সিড়িতে এই অবস্থায় পরা দেখেছে।

আমি আপনাদের প্রতি, মানুষের প্রতি অনুরোধ জানাই ধর্ম-দল-মত নির্বিশেষে আসুন আগে আমরা সকলেই মানুষ হয়ে উঠি এবং মানুষের বিপদে এগিয়ে আসি।

আরেকটি মেসেজ আপনাদের দিতে চাই, সর্তক অবস্থায় গ্লাভস পরে, মুখে মাস্ক পরে, আপনারা যেকোন করোনা রোগীর সেবা করতে পারেন। সেক্ষেত্রে কোন ভয়ের কিছু নেই। দয়া করে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবের মৃত্যুর পর সম্মান জানানোর চেষ্টা করেন।

এরআগে, করোনা সাসপেক্ট খোকন সাহা(৫২) ২৬এপ্রিল (রোববার) গলাচিপায় নিজ বাড়িতে মারা গেছেন। তার পরিবারে ২কন্যা সন্তান রয়েছে এবং তার স্ত্রী। তার কোন আত্মীয় স্বজন এবং পরিবারের কেউ এগিয়ে না আসায় লাশ সংগ্রহ করে কাউন্সিলর খোরশেদ এবং তার টিম সৎকার সম্পন্ন করে। সৎকারের পূর্বে কাউন্সিলর খোরশেদ ওই ভিডিও বার্তা টি সবার জন্য স্যোশাল মিডিয়া ফেইসবুকে নিজস্ব আইডিতে প্রচার করেন।

এসময় কাউন্সিলর খোরশেদের সাথে ছিলেন- আশরাফুজ্জামান হিরা, হাফেজ শিব্বির, আনোয়ার হোসেন, সুমন, রাফি, তানভীর ও গাড়ী চালক শফিউল্লাহ।

প্রসঙ্গত, মাকছুদুল আলম খোন্দকার খোরশেদ ২০০৪ সাল থেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ওয়ার্ডের মোট ভোটার ৫৮ হাজারের বেশি। দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তারের শুরুর দিকে ৯ মার্চ এ জনপ্রতিনিধি লিফলেট বিতরণ এবং জুমার নামাজে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেন। ১৮ মার্চ থেকে নিজ উদ্যোগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার (৬০ হাজার বোতল) বানিয়ে তা বিতরণ করেন। ৩০ মার্চ লাশ দাফন ও দাহ করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমতি পেতে আবেদন করেন (অনুমতি পাওয়ার জন্য বসে না থেকে কাজ শুরু করেন)। এ জনপ্রতিনিধি নারায়ণগঞ্জে একটি ল্যাব স্থাপনেরও আবেদন করেন। খোরশেদ ও তার টীম এ যাবৎ করোনা আক্রান্ত ও করোনার নানা উপসর্গে মৃতসহ ত্রিশের অধীক লাশ দাফন-সৎকার করেছেন।

0