ক্রীড়া সংস্থা নি‌য়ে আইভীর বক্ত‌ব্যের জবাব টিটুর

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ: দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থা। এতে করে যেমন নতুন খেলার সুযোগ বাড়ছে, তেমনই সামনে আসছে নতুন নতুন খেলোয়ার। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত অর্থে আয়োজন করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের খেলা। তবে, সম্পৃতি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর এক বক্তব্য ক্রীড়া সংস্থাকে ঘিরে জন্ম দিয়েছে নতুন আলোচনা।

এদিকে, কোন বিষয়ে সঠিক তথ্য না জেনেই দ্বায়িত্বশীল অবস্থানে থেকে বায়বীয় বক্তব্য না দেয়ার আহবান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক ও নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক তানভীর আহমেদ টিটু।

তিনি বলেন, ‘তিনি ক্রীড়া সংস্থাকে সরকারের দেয়া টাকার কথা বলে আয়-ব্যয়ের প্রশ্ন তুলেছেন। আমি ব্যক্তিগত তহবিলে জেলা ক্রীড়ার সংস্থার নামে ক্রিকেট প্রাকটিসের জন্য সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ে মেয়েদের ক্রিকেটের পিচ ও কোচ এর ব্যবস্থা করেছি। আমরা ব্যক্তিগত অর্থায়নে নারায়ণগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গণকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করলেও ঢোল পিটিয়ে বেড়াই না।’

জানা গেছে, গত ২১ ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে ক্রীড়া সংস্থার কঠোর সমালোচনা করেন মেয়র আইভী। তিনি বলেন, ‘সরকার লক্ষ লক্ষ টাকা দিচ্ছে ক্রীড়া সংস্থা থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে। সেই ক্রীড়া সংস্থা দায়-দায়িত্ব নিয়ে খেলা ছাড়ে না কেন আমি জানি না! নারায়ণগঞ্জের ক্রীড়া সংস্থার ভূমিকা কি সেটা আমি আজ পযর্ন্তও জানতে পারলাম না। তারা না ফুটবল খেলা ছাড়ে না অন্য কোনো খেলা ছাড়ে। সরকার এতো টাকা দেয় সেগুলো কোথায় যায়?’

মেয়র আরও বলেন, ‘যারা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ও সেক্রেটারি হয়ে দেশ বিদেশে ঘুড়ে বেড়ায় আমার প্রশ্ন তাদের কাছে তারা কি করে? নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা যখন ছিলো তখন ক্রীড়া সংস্থাকে মেয়র কাপ খেলার জন্য ৫ লক্ষ টাকা দিয়েছিলো। আমরা আজ পযর্ন্ত সে টাকার হদিস পাই নাই এবং কোনো মেয়র কাপ খেলাও ছাড়ে নাই।’

এমন বক্তব্যের পর থেকেই শহর জুরে চলছে আলোচনা। তবে, বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে মেয়র আইভীর এসব বক্তব্যকে উল্টে দিয়েছেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার এই শীর্ষ কর্তা। তিনি বলেন, ‘সিটি মেয়র নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থা সম্পর্কে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন সেগুলো তিনি কারো শোনা কথার প্রেক্ষিতেই, কোন খোঁজ না নিয়ে জনসম্মুখে বলে দিয়েছেন বলেই আমার ধারনা। নারায়ণগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে কথা বলার আগে তার একটু খোঁজ নেয়া উচিত ছিল।’

গণমাধ্যমকে দেয়া এক স্বাক্ষাৎকারে বিসিবি পরিচালক তানভীর আহমেদ টিটু এসব কথা বলেন।

টিটু বলেন, ‘জেলা ক্রীড়া সংস্থা যে ১৯৯০ সালের পর থেকে ফুটবল লীগ আয়োজনের সাথে সংযুক্ত নয়, এই তথ্যটুকুও তিনি জানেন না। কারণ সারা দেশের ক্রীড়াঙ্গন যেখানে নারায়ণগঞ্জের বর্তমান খেলাধুলার অবস্থান নিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করে সেখানে তার মতো একজনের এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক।’

পৌরসভার জন্য ৫ লক্ষ টাকার বিষয়ে তানভীর আহমেদ টিটু এই প্রতিবেদককে জানান, ‘তৎকালীন পৌরসভা আমলে জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে পৌর গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্য ৫ লাখ টাকা দিয়েছিল এবং সেই টাকার কোন হদিস নেই বলে যে অভিযোগ মেয়র আইভী করেছেন তা হাস্যকর। কারণ ১৯৯০ সালে পৌর গোল্ড কাপ আয়োজনের জন্য তৎকালিন পৌর প্রশাসক একটি ট্রাস্টী বোর্ড করেছিল। ঐ বোর্ডের সভাপতি ছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক, সদস্য ছিলেন পৌর প্রশাসক, পুলিশ সুপার, একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও তৎকালীন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক। ১৯৯১ সালে ১লাখ টাকা খরচ করে সেই টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছিল এবং বাকি ৪লাখ টাকা এখনও এ বি ব্যাংকে ট্রাস্টী বোর্ডের নামে জমা করা আছে। পৌরসভার ৫ লক্ষ টাকা নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়ার কাছে কখনই আসেনি বা ক্রীড়া সংস্থা কখন খরচও করেনি।’

তাছাড়া ফুটবলের সকল কিছু করে জেলা ফুটবল এসোসিয়েশন, ক্রীড়া সংস্থা না। তারপরও ফুটবলের উন্নয়নের জন্য আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে স্পন্সার করে একটি অনুর্ধ ১২ ফুটবল টুর্নামেন্ট এর আয়োজন করেছি যা এই মুহুর্তে চলমান আছে।

টিটু বলেন, ‘তিনি (মেয়র আইভী) ক্রীড়া সংস্থাকে সরকারের দেয়া টাকার কথা বলে আয়-ব্যয়ের প্রশ্ন তুলেছেন। এই বিষয়ে তার জ্ঞানের পরিধি দেখে আমি হতাশ। মূলত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মাধ্যমে জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে আগে বছরে ৪লাখ টাকা করে দেয়া হোত। গত ২বছর ধরে সেই টাকার পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ হয়েছে। এছাড়া ক্রিকেটের জন্য ক্রিকেট বোর্ড থেকে ক্রীড়া সংস্থাকে বছরে ৭/৮ লাখ দেয়া হয়। এর বাইরে সরকারী কোন বরাদ্ধ খেলাধুলার জন্য আসেনা। অথচ স্কুল ক্রিকেট, অনুর্ধ্ব ১৪, অনুর্ধ্ব ১৬, অনুর্ধ্ব ১৮ ও জাতীয় লীগ ক্রিকেটেই খরচ আসে বছরে ১২/১৩লাখ টাকা। এছাড়া প্রিমিয়ার বিভাগ, ১ম বিভাগ, ২য় বিভাগ ও কোয়ালিফাইং ক্রিকেটের জন্যই বছরে খরচ লাগে ১৯/২০লাখ টাকা। এছাড়া বিদ্যুত বিল, স্টাফদের বেতনসহ অনুষাঙ্গিক খরচ আসে বছর ৭/৮লাখ টাকা। ক্রিকেটের পাশাপাশি অন্যান্য খেলাগুলোতেও আমরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ থেকে প্রমোট করি এবং বাংলাদেশের প্রতিটি ফেডারেশনের প্রতিটি আয়োজনে নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থা অংশ গ্রহন করে।’

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সেক্রেটারি বলেন, ‘চলমান শেখ কামাল ২য় যুব গেমসে নারায়ণগঞ্জ জেলা কাবাডি, ভলিবল, দাবা, বক্সিং, জুডো, কারাতে ও তায়কোয়ান্দতে সফলভাবে অংশ নিয়েছে। সেখানে অলিম্পিক এসোসিয়েশন ২লাখ টাকা বরাদ্ধ দেয়ার পরেও ১লাখ টাকার বেশী অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। আমরা প্রতি বছর ভলিবল লীগ করি যেখানে বছরে ৩লাখ টাকার অধিক খরচ হয়, পুলিশের আইজিপি মহোদয়ের উদ্যোগে প্রথমবারের মত ঢাকায় কর্পোরেট মহিলা কাবাডি লীগের আয়োজন করেছে, যেখানে নারায়নগঞ্জ এর নামে একটি টিম করা হয়েছে যেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০লাখ টাকা। যা সম্পুর্নভাবে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে দেয়া হচ্ছে। তাহলে সরকারী টাকার বাইরে প্রতি বছর এসব খেলাধুলায় অতিরিক্ত ৪০/৪৫লাখ টাকা যে বেশী খরচ হচ্ছে সেগুলোর খবর কি মেয়র মহোদয় রেখেছেন? সেগুলো আমি ও আমার ক্রীড়া সংস্থার সদস্যরাই ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এবং বিভিন্ন স্পন্সারদের মাধ্যমে দিচ্ছি কারণ আমরা খেলাকে ভালোবাসি, এবং নারায়ণগঞ্জকে খেলাধুলায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। আমরা ক্রীড়া জগতের মানুষ।’

টিটু বলেন, ‘সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ে মেয়েদের ক্রিকেটের জন্য আমি ব্যক্তিগত তহবিলে জেলা ক্রীড়ার সংস্থার নামে ক্রিকেট প্রাকটিসের জন্য পিচ ও কোচ এর ব্যবস্থা করেছি। ক্রিকেটের প্রতি আমাদের নিরলস কাজের ফসল আজ জাতীয় ক্রিকেট দলে একজন, জাতীয় এ দলে একজন ও অনুর্ধ্ব ১৯ জাতীয় দলে ২জন নারায়ণগঞ্জের ক্রিকেটার খেলছেন। বর্তমান কমিটি দ্বায়িত্ব নেয়ার পর খেলা ও মাঠের চেহারা পাল্টে দেয়ার জন্যই কাজ করছে। আমরা ব্যক্তিগত অর্থায়নে নারায়ণগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গণকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করলেও ঢোল পিটিয়ে বেড়াই না। মেয়র কে ধন্যবাদ, তিনি এসব বায়বীয় কথাবার্তা না বললে হয়তো এই বিষয়ে তিনিও জানতেন না। আর নারায়ণগঞ্জের সকলের কাছে বলার সুযোগটুকুও হয়তো হতো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ২০১১ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নারায়ণগঞ্জ এ খেলাধুলার মান ও পরিমান দুটোই বাড়িয়েছি। একটা মাঠ থেকে ৩ টা মাঠ হয়েছে। পুর্নাঙ্গ ক্রীড়া কমপ্লেক্স করার প্রক্রিয়া চলছে। সেটাই আমার এবং আমাদের কমিটির সকলের স্বপ্ন। সুতরাং এই ধরনের বক্তব্য না দিয়ে সকলকে সাথে নিয়ে কিভাবে একটি সুন্দর নারায়নগঞ্জ করা যায়, আমার মনে হয় আমাদের সকলের সে বিষয়ে সুনজর দেয়া উচিত।’

,