গুরুত্ব পায়নি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, বাজেট ঘোষণায় যা বললেন আইভী

0

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (এনসিসি) ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে ৬৮৮ কোটি ২৩ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। শিক্ষার হার ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বিশেষ কোন বরাদ্দ রাখা হয়নি।

নগরীর আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলানয়াতনে সোমবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় এ বাজেট ঘোষনা করা হয়। এ সময় এনসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল আমিন, প্যানেল মেয়র আফরোজা বিভাসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা উপস্থিত ছিলেন।

মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রক্কালে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতে মোট ৬৮৮ কোটি ২৩ লাখ ১৭ হাজার ৩৫৬ টাকা আয় এবং ৬৭৭ কোটি ৪৯ লাখ ৭৩ হাজার ৩৪০ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। বছর শেষে ঘোষিত বাজেটে ১০ কোটি ৭৩ লক্ষ ৪৪ হাজার ১৬ টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে।

কোন খাত না থাকলেও ঘোষিত বাজেটে অবকাঠামোগত উন্নয়ন- রাস্তা, ড্রেন, ব্রীজ, কালভার্ট নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণ, বৃক্ষ রোপন, দারিদ্র বিমোচন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জরুরী ত্রাণ, তথ্য-প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যানজট নিরসন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, মশক নিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, খেলাধূলার মানোন্নয়ন মাঠ নিমার্ণ, স্ট্রীট লাইট স্থাপনসহ সূপেয় পানি সরবরাহ খাতে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্প সহায়তার মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণ ও পুনঃ নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন খালসমূহ খননের মাধ্যমে জলাধার সংরক্ষণের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সিদ্ধিরগঞ্জ ডিএনডি ক্যানেলের পুনঃখনন, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করণ, জলাধার সংরক্ষণ, আলোকিতকরণ, ও ড্রেনসহ ওয়াকওয়ে নির্মাণ। ৫নং গুদারাঘাটের নিকট শীতলক্ষ্যা নদীর উপর দিয়ে কদমরসুল ব্রীজ নির্মাণ। জাতীয় দিবসসমূহ উদযাপনসহ রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বাজেট ঘোষনার পর জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে সাংবাদিকদের মেয়র আইভী বলেন, ‘আমরা নবাব সালিমুল্লাহ সড়কটি নৌ মন্ত্রনালয়ের কাছে দিয়ে দিয়েছি। তারা নদীর পারে একটি কন্টেনার পোর্ট নির্মান করবে। এছাড়া মহামান্য হাই কোর্ট একটি ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছেন যে নদীর দুপাশে যে যায়গাটি রয়েছে সেটি স্ব স্ব সিটি কর্পোরেশনের আওতায় থাকবে। তাই আমারা শীতলক্ষ্যার দু পারে সোন্দর্য বর্ধনের কাজ করছি। পাশাপাশি আমরা বাবুরাইল লেকটিকে আরো চওরা করেছি যাতে এটি আরও সুন্দর হয়।’

মেয়র আইভী বলেন, ‘আমরা নারায়ণগঞ্জকে মেট্রোপলিটনে অন্তরভুক্ত করার জন্য আবেদন করেছি। বাকিটা সরকার যদি চায় তাহলে হবে। এছাড়া সারা নারায়ণগঞ্জে ২টি মেট্রো রেল আসছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এনিয়ে কাজ করছে। সাড়া দেশে ১৪টি মাল্টি মিডিয়া হাবের মধ্যে একটি নারায়ণগঞ্জে নির্মান করা হবে। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জে ৭টি মডেল মসজিদ হবে এর মধ্যে ৫টির কাজ চলমান রয়েছে বাকি ২টি শিগ্রই শুরু করবো। মন্দির হয়েছে, খিস্টান ধর্মাবলম্বিদের জন্য কবরস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২৬নং ওয়ার্ডে শ্মশানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিছু সাংবাদিক আমাকে ভুমিদস্যুর আমি এ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে সরকারের ৯৫ ভাগ জমি উদ্ধার করেছি, আরও ৫ ভাগ শীঘ্রই উদ্ধার করবো ‘

মাদকের বিষয়ে মেয়র আইভী বলেন, ‘সরকার টানবাজারে ২টি বিশার বিল্ডিং তৈরি করে দিয়েছে সেই বিল্ডিং গুলোতে কেউ মাদকের ব্যবসা করলে পুলিশের প্রতি আমার অনুরোধ রইলো আপনারা ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। মাদক কিন্তু বর্তমানে সারা নারায়ণগঞ্জেই ছড়িয়ে পরেছে।’

জলাবদ্ধতার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরের মেয়র আইভী বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি কর্পোরেশন ব্যাপক কাজ করেছে৷ তারপরও জামতলা, ইসদাইর, মাসদাইর এলাকায় পানি জমেছে৷ এসব এলাকার বড় একটি আউটলেট ছিল কালিয়ানী খাল৷ সেই খাল দখল-দূষণে প্রায় ভরাট হয়ে গেছিলো৷ অনেক টাকা খরচ করে একটি উভচর এক্সাভেটর দিয়ে কালিয়ানী খাল খনন করেছি৷ কিন্তু ফকির অ্যাপারেলসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের দখলের কারণে সুফল পাচ্ছি না৷ উচ্ছেদের জন্য ডিসিকে চিঠি দিয়েছি৷ এগুলো উচ্ছেদ করতে পারলে সুফল পাওয়া যাবে৷ গলাচিপায় বড় একটি ড্রেন করে দিয়েছি৷ কিন্তু ড্রেন দিয়ে পানি নামে না৷ ড্রেনের ভেতর মাটি থেকে শুরু করে সবকিছু জমে থাকে৷ বাড়ির মালিকরা তাদের সুয়ারোজ লাইন সরাসরি ড্রেনের সাথে সংযোগ করে দেয়৷ এগুলোর জন্য জরিমানা করেছি, সতর্ক করেছি কিন্তু কাজ হয়নি৷ সাধারণ মানুষকেও তো সচেতন হতে হবে।’

সিটি করপোরেশনের উন্নয়ণে বাঁধা-বিপত্তির বিষয়ে মেয়র বলেন, সিটি করপোশেনের চারিদিকে উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। তোলারাম কলেজের সামনে থেকে সরকারি বালিকা বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়ক করে দিয়েছি। সড়কের পাশে বনায়ন করে পার্ক করে দিবো ভেবেছি। কিন্তু কে বা কারা এখানে লিজ নিয়ে ব্যবসা করছে। শহরকে সুন্দর করতে হলে শহরবাসীর পাশাপাশি প্রশাসনের সহযোগিতা দরকার। আমরা অনুরোধ করব যদি জেলা পরিষদ লিজ দিয়ে থাকে, তাহলে লিজগুলো যেন বাতিল করে দেওয়া হয়। চাইলে জেলা পরিষদ নিজেও এই জায়গাকে সুন্দর করে তুলতে পারে।

আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বিষয়ে মেয়র আইভী বলেন, ‘আমি তো নৌকার মানুষ৷ জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু আমি মায়ের পেট থেকে শুনে আসতেছি। আসন্ন নির্বাচনে আমি মনোনয়ন চাইবো। নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিলে নৌকা নিয়েই নির্বাচনে অংশ নেবো৷’

চাষাড়া ফুটওভার ব্রীজ নিমার্নের বিষয়ে মেয়র আইভী বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের যনজট নিরসনে যোগাযোগ মন্ত্রনালয় একটি মাস্টার প্লেন তৈরি করে দিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে ৬ লেনের কাজ চলতেছে আবার পঞ্চিবটি থেকে একটি রাস্তা এখানে আসবে। এখন যদি আমি একটি ফ্লাইওভার করে দিই তাহলে এটি ভাঙ্গা পরবে এবং টাকা গুলো নষ্ট হবে। সুতরাং আমি সঠিক ভাবে এর সম্পর্কে বলতে পারছি না।’

এ ছাড়াও স্থানীয় বেশ কিছু নিজ দলিও জনপ্রতিনিধিকে ইঙ্গিত করে মেয়র আইভী বলেন, আমার দলের লোকজনই প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে অনেক বাজে কথা বলে ফেলে। সে সকল কথার জবাব দেয়ার মতো লোকবলসহ সব কিছু আছে। কিন্তু আমি চুড়ান্ত ধৈর্যের পরিক্ষা দিচ্ছি। আমি তাদেরকে অনুরোধ করবো, দয়া করে এতো বড় কথা বলবেন না, যে বড় কথা আপনাদের ধ্বস নামিয়ে দিবে।

মেয়র আইভী বলেন, ‘সবাই নির্বাচন করতে পারে, আমরা সকলেই মনোনয়ন চাইতে পারি। দল করি এর একটা উদ্দেশ্য থাকে, যে আমরা একটা পর্যায়ে যাবো। কিন্তু এরকম বেফায়েশ কথাবার্তা বলে নারায়ণগঞ্জের মাটিকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা করবেন না। নারায়ণগঞ্জেকে জঙ্গি এড়িয়া বানানোর চেষ্টা করবেন না। হিন্দু-মুসলমান লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা কইরেন না। দুই দিন পর পর এই যে নাটক সাজান, এগুলি দয়া করে কইরে না। মানুষের কাতারে যান, মানুষ যদি ভোট দেয়, নমিনেশন যদি পান নির্বাচন করবেন। আমাকে মনোনয়ন দিলে আপনারা কাজ করবেন, আপনাদের দিলে আমি কাজ করবো। কিন্তু নাটক সাজাইয়া মিখ্যা কথা বলে এসব করবেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটা সিটি কর্পোরেশনকে যদি গভার্মেন্ট সহযোগিতা না করে তাহলে কি সে সিটি কর্পোরেশন কি কাজ করতে পারে। তাহলে আমরাও তো গভার্মেন্ট একটি পার্ট, আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি পার্ট। এখন আপনে জায়গা জায়গা গিয়ে কইবেন- এই কাজ করছে গভারমেন্ট, আইভী কেন বলে না। তাহলে আইভী কার কথা বলে? আমাদের নগর ভবনের প্রথম কাজ করেছি নারায়ণগঞ্জের জনগনের টাকায়। পরে বাকি অংশের কাজ করার জন্য সরকারের কাছে কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়েছে। কেন করেছি এটা? কারন নারায়ণগঞ্জের মানুষের যাতে ভাবে নগর ভবন আমাদের। শেখ হাসিনা আমার নেত্রী, এখন আপনারা বার বার আমারে বানাইতে চান আমি জামাত-বিএনপি। তাতে আমার আপত্তি নাই। মানুষ জানে আমি কি, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রং পাল্টাই না। রং পাল্টানো আমার স্বভাব না। আমার রং কালো এবং কালো মানুষ কালোই আছি। আমি আমার নীতি আদর্শের বাইরে যেয়ে কোন কাজ করবো না, নমিনেশন দিক বা না দিক। কাজ করি আর না করি। এই নারায়ণগঞ্জ শহরের পাশে থাকবো, সন্ত্রাসের বিপক্ষে থাকবো, যত দিন বেচে থাকবো তত দিন অন্যায় এর বিরুদ্ধে থাকবো।’

কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য মেয়র আইভী দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মোকাবেলায় বাড়ী-ঘর ও আঙ্গিনা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি কোথাও যেন পানি জমে এডিস মশার বংশ বিস্তার ঘটতে না পারে সে বিষয়ে নগরবাসীর সজাগ ও সর্তক থাকার আহবান জানান।

মেয়র সকল কাজে নগরবাসীর সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেন এবং পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ার প্রত্যয়ে সময়মত হোল্ডিং কর পরিশোধ করে নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি এড. মাহবুবুর রহমান মাসুম, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুস সালাম, ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন সভাপতি হাজি হাবিবুর রহমান শ্যামল, কাউন্সিলর কবির হোসাইন, হান্নান সরকার, আব্দুল করিম বাবু, সুলতান আহমেদ ভূঁইয়া, শারমিন হাবিব বিন্নি, আয়েশা আক্তার দিনা প্রমুখ৷

0