গ্যাসের দাম বাড়াতে আজ থেকে গণশুনানী শুরুএকচুলা ১ হাজার দুই চুলা ১২’শ টাকা

0

গ্যাসের দাম
গ্রাহক শ্রেনী বর্তমান দাম প্রস্তাবিত দাম
একচুলা ৭৫০টাকা ১০০০
দুইচুলা ৮০০ টাকা ১২০০
সিএনজি ৩২.০০টাকা ৪০.০০
বিদ্যুৎ ৩.১৬ টাকা ৭.৬৬টাকা
ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ ৯.৬২টাকা ১৫.৭০টাকা
সার ২.৭১টাকা ৭.০০টাকা
শিল্প ৭.৭৬টাকা ১৫.০০
বানিজ্যিক ১৭.৪০টাকা ২০.০০
আবাসিক মিটার ৯.১০টাকা ১৩.৬৫টাকা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ: আবাসিকসহ সব খাতের গ্যাসের দাম বাড়নোর জন্য আজ থেকে গণশুনানী শুরু করছে বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন(বিইআরসি)। দাম বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কোম্পানীর দেয়া প্রস্তাব নিয়ে এ শুনানী শুরু হচ্ছে।

সব গ্যাস বিতরন ও কোম্পানী গ্যাসের দাম বাড়ানো প্রস্তাব করে । তবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির তৎপরতা নিয়ে ক্ষুদ্ধ মানুষ। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিকদল এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর তৎপরতার বিরুদ্ধে আগামী ১৩ মার্চ কাওরান বাজার বিইআরসি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে। জনস্বার্থের চেয়ে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থকে প্রাধ্যান্য দিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে তারা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো লাভে থাকলে বিইআরসির আইন অনুযায়ীই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে না। দেশে গ্যাস সঞ্চালন কোম্পানি একটি। আর বিতরণ কোম্পানি তিতাস, বাখরাবাদ, কর্ণফুলীসহ ছয়টি। এর মধ্যে একটি (সুন্দরবন) ছাড়া বাকি পাঁচটি কোম্পানিই লাভে রয়েছে। একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানি জিটিসিএলও লাভে আছে। এই অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াকে আইনের লঙ্ঘন হিসেবেই দেখছেন তাঁরা।

বিইআরসিতের দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী , গ্রাহক পর্যায়ে এক বার্নারের গ্যাসের চুলা ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা, দুই বার্নারের চুলা ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০০ টাকা এবং মিটারযুক্ত চুলার ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৯ টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৩ টাকা ৬৫ পয়সা করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহকৃত গ্যাসের দাম ঘনমিটার প্রতি ৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা ৬৬ পয়সা, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের ক্ষেত্রে ৯ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা ৭০ পয়সা, সার কারখানার ক্ষেত্রে ২ টাকা ৭১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭ টাকা, শিল্প কারখানার ক্ষেত্রে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১৫ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৭ টাকা ৪০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা এবং সিএনজির গ্যাসের দাম ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। এদিকে চার মাসের মাথায় পুনরায় গ্যাস সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সঞ্চালন চার্জ ঘনমিটার প্রতি ০.২৬৫৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ০.৪২৩৫ টাকা করেছিল কমিশন।

বিইআরসির কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন ২০০৩ অনুযায়ী জিটিসিএল, তিতাস গ্যাস, বাখরাবাদ গ্যাস, জালালাবাদ গ্যাস, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস, কর্ণফুলী গ্যাস, সুন্দরবন গ্যাস তাদের বিতরণ চার্জ ও ভোক্তা পর্যায়ে দাম পুননির্ধারণের জন্য কমিশনে আবেদন জমা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দিন ১১ মার্চ সোমবার সকাল ১০টায় গ্যাসের দামের ওপর একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করবে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। একই দিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) প্রস্তাবিত সঞ্চালন চার্জের ওপর শুনানি হবে। পরদিন ১২ মার্চ সকালে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রস্তাবিত দামের ওপর শুনানি হবে। দুপুর আড়াইটা থেকে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাবের ওপর শুনানি হবে।

১৩ মার্চ সকালে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আর দুপুরে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের প্রস্তাবের ওপর শুনানি করা হবে। এছাড়া ১৪ মার্চ সকালে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড এবং দুপুরে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাবিত দামের ওপর শুনানি করবে কমিশন।
বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেন ‘বিতরণ সংস্থাগুলো একটি প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা সে অনুযায়ী গণশুনানির আয়োজন করেছি। গ্যাসের দাম বাড়বে কি না, সেটি গণশুনানিতে আলোচনা শেষে বিইআরসি তার পদ্ধতি অনুযায়ী ঘোষণা দেবে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, আইন অনুযায়ী একবার মূল্যবৃদ্ধির ১২ মাসের মধ্যে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিতে পারে না সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পাজ্বিালানি পণ্যের দাম বাড়ানোর চন্য বিইআরসি যে গণশুনানি করে, তা লোক দেখানো বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, ‘গতবারও দাম বাড়ানোর আগে গণশুনানিতে আমরা প্রমাণ করেছিলাম, গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো লাভে রয়েছে, কিন্তু বিইআরসি ঠিকই গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। আসলে আগে থেকেই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে গণশুনানি করে বিইআরসি।

এদিকে গ্যাসের মূল্য বাড়ার সাথে সাথে জনজীবনের দুর্ভোগ বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কেননা, গ্যাসের মূল্য বাড়লে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে বাড়বে শিল্পের উৎপাদন ব্যয়। আর শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। একদিকে আবাসিকে গ্যাসের দাম বাড়ার ফলে জনসাধারণের বাড়তি অর্থ গুনতে হবে, এর ওপর পণ্যের দাম বেড়ে গেলে জনসাধারণের দুর্ভোগ চরম আকারে বেড়ে যাবে। তাদের মতে, গ্যাস উৎপাদন বাড়লে উচ্চমূল্যের জ্বালানি আমদানি করা হতো না। তারা বলেন, দেশে গ্যাসের মজুদ দ্রুত ফুরে আসছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্রে আবিষ্কার না হলে দেশের জ্বালানি সম্পূর্ণ উচ্চমূল্যের জ্বালানিনির্ভর হয়ে পড়বে। গ্যাসের দাম বহুগুন বেড়ে যাবে। বেড়ে যাবে সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন মূল্য। শিল্পে অচলাবস্থা দেখা দেবে।

বাম গণতান্ত্রিক জোট নেতৃবৃন্দ বলেছেন, এখতিয়ার বহির্ভূত গণশুনানি করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-কে জনগণের পকেট কাটতে দেয়া হবে না। তারা বলেন, বিইআরসি ভোক্তাদের স্বার্থ না দেখে সরকারের গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আগামীকাল ১১ মার্চ থেকে গণশুনানি করতে যাচ্ছে। এর মধ্যদিয়ে বিদ্যুৎ, সার, শিল্প, আবাসিকসহ সবখাতে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সরকারের লুটপাটের প্রজেক্ট এর টাকার জোগান এবং কমিশন ভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী করতে চাইছে। অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক গণশুনানি বন্ধ করে গ্যাস খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম দূর করতে ভোক্তাদের স্বার্থে দাম কমানোর জন্য গণশুনানির দাবি জানান।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, অধিকাংশ স্থানে দিনের বেলা চুলায় গ্যাস থাকে না, মিটারবিহীন চুলায় গ্রাহকরা কম গ্যাস ব্যবহার করে বেশি দাম দিচ্ছে। আর সারাদেশে সাধারণ মানুষ বেশি দাম দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছে। বক্তারা বলেন, গ্যাসের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে উচ্চ মূল্যে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে যা ভারত যে দামে আমদানি করে তার থেকে দেড়গুণ বেশি দামে। বক্তারা শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করে দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্র বক্ষের গ্যাস উত্তোলনে জরুরিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।

বক্তারা গ্যাস খাতে দুর্নীতির সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করা ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও জোর দাবি জানান। বক্তাগণ গণশুনানির নামে গণতামাশা বন্ধ করে জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা পালনের জন্য বিইআরসির প্রতি আহ্বান জানান। অন্যথায় আন্দোলনের কঠোর কর্মসূচি দিয়ে দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা বন্ধ করতে বাধ্য করা হবে বলে হুশিয়ারী দেন।
বিইআরসিতে দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন করে গ্যাসের দাম না বাড়ালেও চলতি অর্থবছরে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৫৫০ কোটি টাকা মুনাফা করবে। প্রস্তাবে তিতাস বলেছে, গ্যাসের দাম না বাড়ালে মুনাফা কম হবে, সে কারণে লভ্যাংশ দেওয়া (শেয়ার গ্রহীতাদের) সম্ভব হবে না। একইভাবে জালালাবাদ (বার্ষিক মুনাফা ১০০ কোটি টাকা), পশ্চিমাঞ্চল (বার্ষিক মুনাফা ৫১ কোটি টাকা), কর্ণফুলী (বার্ষিক মুনাফা ২৪৭ কোটি টাকা)। বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লাভলোকসানের পূর্ণাঙ্গ তথ্য বিইআরসিকে দেওয়া প্রস্তাবে উল্লেখ করেনি। এর বাইরে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লোকসানে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো কুষ্টিয়া ঢাকা পাইপলাইন স্থাপন। এটি স্থাপনে কোম্পানিটি ৫৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আর গ্যাস সঞ্চালন কোম্পানি জিটিসিএলের বার্ষিক মুনাফা ১৬ কোটি টাকা।

0