চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে রোযা

0

সাধারণভাবে অনেকে মনে করে থাকেন যে, রোযা সাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মাসব্যাপী রোযা পালনের ফলে দেহের পুষ্টি ধারণে ব্যাঘাত ঘটে। অসুস্থ রোগী আরো অসুস্থ্য হয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নত গবেষণার ফলে দিন দিন বেড়েই চলছে রোযার চমৎকার উপকারিতার কথা। রোযা পালন সস্থ্যের জন্য ক্ষতিকরতো নয়ই বরং রোযা রোগমুক্তির অন্যতম উপায়, সুস্থ্য হওয়ার গ্যারান্টি।


আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে সুস্থ্য জীবন লাভের জন্য বেশি বেশি খাওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং কম ও পরিমিত খাওয়াই সুস্থ্য জীবনের মূলমন্ত্র।

গ্রাম বাংলায় একটি কথা প্রচলিত আছে তা হলো- “বেশি বাঁচবি তো কম খাবি”- এই প্রবাদ বাক্যটি বৈজ্ঞানিক ভাবে সত্য প্রমাণিত।

চিকিৎসা শাস্রের জনক ডাক্তার হিপ্পোক্রিট্যাস বহু শতাব্দি পূর্বে বলেছেন, “অসুস্থ্য দেহে যতই খাবার দিবে ততই রোগ বাড়তে থাকবে।

প্রখ্যাত মুসলিম চিকিৎসক ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ইবনেসিনা তাঁর রোগিদের ৩ সপ্তাহের জন্য উপবাস/রোযা পালনের নির্দেশ দিতেন। ঔষধের পরিবর্তে উপবাস রোগ মুক্তির জন্য যথেষ্ট ছিল।

রাশিয়ার প্রখ্যাত শরীর বিজ্ঞানী অধ্যাপক ডাক্তার ডি,এন, নাকিটন বলেছেন-“তিনটি নিয়ম পালন করলে শরীরের বিষাক্ত দ্রব্যাদি বের হয়ে যাবে এবং বার্ধক্য থামিয়ে দিবে। নিয়ম তিনটি হলো- অধিক পরিশ্রম করা, অধিক পরিমাণে ব্যায়াম করা এবং প্রত্যেক মাসে একদিন উপবাস থাকা।”

মহাত্ম গান্ধী রোজা রাখা পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন মানুষ খাবার খেয়ে নিজের দেহকে ভারী করে ফেলে। এরকম ভারী অলস দেহ দুনিয়ার কোনো কাজে আসে না। তাই তোমরা যদি তোমাদের দেহ কর্মঠ এবং সবল রাখতে চাও তবে দেহকে কম খাবার দাও। তোমরা উপস থাকো।

আলেকজান্ডার গ্রেট বলেন, সকাল -সন্ধ্যা যে আহার করে সে রোগমুক্ত। যখন আমি ভারত আক্রমন করেছিলাম তখন আমি ভারতে এরকম প্রচ- উষ্ণ এলাকা দেখেছি। সেখানে সবুজ গাছপালা পুরে গেছে। কিন্তু সেই তীব্র গরমের মধ্যেও আমি সকালে এবং বিকালে খেয়েছি। সারাদিন কোনো প্রকার পানাহার করিনি। এর ফলে আমি অনুভব করেছি এক নতুন অফুরন্ত প্রাণশক্তি

এবার আসা আসা যাক আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোযা নিয়ে গবেষনার ফল –

ব্রেনের কর্ম ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় (Boost in brain)
আমাদের ব্রেন এবং স্পাইন কর্ড এক ধরনের neuro protein নি:সরন করে যাকে brain-derived neurotrophic factor বলে, এই neuro protein আমাদের ব্রেনের ব্রেন কোষ নিউরোন তৈরীতে, নিউরোনের পুষ্টি জোগাতে এবং নিউরোনকে সজীব রাখতে সাহায্য করে। গবেষনায় দেখা গিয়াছে যে রোযা রাখলে এই neuro protein এর নি:সরন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক গুন বেড়ে যায় ফলে অসংখ্য নতুন নতুন নিউরোন সৃষ্টি হয়, ফলে ব্রেন সতেজ থাকে এবং এর ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে রোযা রাখা অবস্থায় ব্রেনের কর্ম ক্ষমতা, কর্ম তৎপরতা বা কর্ম চাঞ্চল্যতা অনেক গুন বেড়ে যায়।
গবেষনায় আরো দেখা গিয়াছে যে যেহেতু রোজা রাখা অবস্থায় ব্রেনের নতুন নতুন নিউরোন সৃষ্টি হয় ফলে রোযা ব্রেনকে Neurodegenerative Disorders এর হাত থেকে রক্ষা করে, ফলে Neurodegenerative Disorder এর জনিত বিভিন্ন রোগ যেমন Alzheimer’s, Dementia এবং Parkinson’s জাতীয় জটিল রোগ থেকে আমাদের মুক্ত রাখে.

আমাদের মেরুদন্ডের ২ পাশে ২টা কিডনী আছ এবং এই ২টা কিডনীর উপর আবার Adrenal gland নামক ২টি গ্লান্ড থাকে যা থেকে Cortisol নামক এক ধরনের হরমন নি:সরন হয়। এই হরমন আমাদের রক্তের চাপ, রাক্তের সুগার, আমাদের দেহের Stress নেওয়ার ক্ষমতা , দূর্বলতা, দেহের বিভিন্ন Inflammation, দেহের ওজন বৃদ্ধি, দেহের বিপাক ক্রিয়া, মস্তিস্কের Concentrating ক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রন করে। যদি এই হরমনের নি:সরন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী হয় তবে আমাদের উচ্চ রক্ত চাপ , ডায়াবেটিস, অত্যাধিক দূর্বলতা, দেহের বিভিন্ন Inflammation, দেহের ওজন বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে এবং দেহের Stress নেওয়ার ক্ষমতা এবং মস্তিস্কের Concentrating ক্ষমতা কমে যায় এবং দেহের Metabolism বা বিপাক ক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটে । গবেষনায় দেখা গিয়াছে যে যদি Cortisol এর পরিমান বাড়তি থাকে তবে রোযা রাখা অবস্থায় এই হরমনের নি:সরন কমে যায় এবং তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে ফলে আমাদের দেহের Stress নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, দেহের বিভিন্ন Inflammation কমে যায়, দেহের Metabolism বা বিপাক ক্রিয়া বৃদ্ধি পায়, উচ্চ রক্ত চাপ , ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রন থাকে – ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে রোযা রাখা অবস্থায় মস্তিস্কের Concentrating ক্ষমতা , কর্ম তৎপরতা বা কর্ম চাঞ্চল্যতা এবং দেহের Stress নেওয়ার ক্ষমতা অনেক গুন বেড়ে যায়।

অকাল বার্ধক্য রোধ করে , আয়ুশকাল বাড়িয়ে দেয়
এক গবেষনায় দেখা গিয়াছে যে যারা এক দিন পর পর রোযা রাখে বা উপস থাকে তাদের ক্ষেত্রে বার্ধক্য অনেক দেরিতে আসে এবং তাদের আয়ুশকাল ৮৩% বেশী হয়, যারা রোজা বা উপস থাকেনা তাদের চেয়ে। কেননা যে দেহের Stress নেওয়ার ক্ষমতা বেশী থাকে এবং যে দেহের বিভিন্ন Inflammation হওয়ার প্রবনতা কম থাকে- সে দেহেরই বার্ধক্য অনেক দেরিতে আসে এবং তাদেরই আয়ুশকাল বেশী হয়, আর এই stress এবং Inflammation কে নিয়ন্ত্রন করে Cortisol নামক এক প্রকার হরমন – যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

গ্রোথ হরমন (HGH) নি:সরন বেড়ে যায়
আমাদের ব্রেনে Pituitary gland নামক ২টি গ্লান্ড থাকে যা থেকে HGH (human growth hormone) নামক এক প্রকার হরমন নি:সৃত হয়। এই হরমন আমাদের দেহের বৃদ্ধি, দেহের বিপাক ক্রিয়া (metabolism), দেহে শক্তি সঞ্চয়, দেহের ওজন হ্রাস (weight loss) ও দেহের মাংসপেশীর শক্তি বৃদ্ধি, হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি ইত্যাদিতে অগ্রনী ভুমিকা পালন করে। গবেষনায় দেখা গিয়াছে রোযা রাখা অবস্থায় HGH হরমনের নি:সরনের পরিমান বেড়ে যায়। সুতরাং রোযা অবস্থায় আমাদের দেহের সার্বিক বৃদ্বি ঘটে, দেহের বিপাক ক্রিয়া আরো দ্রুত ঘটে, দেহের প্রয়োজনিয় শক্তি আরো বৃদ্বি পায়।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রন করে
যারা টাইপ-২ (Non insulin dependent diabetes) ডায়াবেটিসে ভুগছেন – অথ্যাৎ যাদের ইনসুলিন উৎপাদন ঠিক আছে কিন্তু রক্তের সুগার কমছে না অথ্যাৎ যাদের ইনসুলিন ঠিক মত কাজ করছে না (Resistance insulin), তাদের ক্ষেত্রে গবেষনায় দেখা গিয়াছে যে রোজা রাখা অবস্থায় Insulin এর Resistance উঠে গিয়ে ইনসুলিন পুনরায় কাজ করা শুরু করে দেয় ফলে রক্তে সুগারের মাত্রা বেশী থাকলে তা কমতে কমতে নরমালে চলে আসছে।

রক্তের খারাপ চর্বী/ফ্যাট কমিয়ে ভাল চর্বী/ফ্যাট তৈরী করে
অমাদের রক্তে LDL (Low-density lipoproteins) ও Triglyceride নামক খারাপ চর্বী/ফ্যাট থাকে এইগুলির মাত্রা রক্তে যত বেশী পরিমান থাকবে ততই রক্তে Cholesterol এর মাত্রা বেড়ে যাবে এবং ততই রক্ত ঘন হওয়ার মাত্রা বেড়ে যাবে যার ফলে আমাদের হার্টের আর্টারী ব্লক হওয়ার সম্ভাবনাও অধিক হারে বেড়ে যাবে এবং আমাদের হার্টের কার্য ক্ষমতা দিন দিন কমে গিয়ে হার্টের অনেক রোগ দেখা দিতে পারে, সর্বপরি হার্ট ষ্ট্রোকের ঝুকিও বেড়ে যায় । গবেষনায় দেখা গিয়াছে যে রোজা রাখা অবস্থায় রক্তের খারাপ চর্বী/ফ্যাট কমিয়ে HDL (High-density lipoproteins) নামক ভাল চর্বী/ফ্যাট তৈরী হয়। এই HDL রক্তের Cholesterol কমিয়ে রক্তের প্রেসার নিয়ন্ত্রন রেখে হার্ট ষ্ট্রোকের ঝুকি থেকে আমাদের রক্ষা করে।

স্থূলতা (Obesity) কমিয়ে আনে
যখন শরীরে অতিরিক্ত পরিমানে চর্বি জাতীয় পদার্থ জমা হয়, শরীরের এই মুটিয়ে যাওয়ার বিশেষ অবস্থাকেই স্থূলতা (Obesity) বলে। স্থূলতা নিজে কোন একক রোগ নয় সে বহুবিদ রোগের জন্মদাতা যেমন- হার্টের রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট, অস্টিওআর্থারাইটিস এবং কয়েক ধরনের ক্যান্সার ইত্যাদি। যেহেতু গবেষনায় দেখা গিয়াছে যে রোযা রাখা অবস্থায় রক্তের খারাপ চর্বী/ফ্যাট LDLও Triglyceride –এর মাত্রা কমিয়ে HDL নামক ভাল চর্বী/ফ্যাট তৈরী হয়। সুতরাং রোযা রাখা অবস্থায় স্থূলতার মাত্রা কম হওয়ায় দেহ থাকে স্লিম এবং সর্বপরি দেহে অনেক খারাপ রোগ বাসা বাধতে পারে না।

ক্যানসার প্রতিরোধ করে এবং ক্যামোথ্যারাপির কার্যকারিতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়
গবেষনায় দেখা গিয়াছে যে শরীরে যদি ক্যানসারের কোষ বা টিউমার থাকে তবে রোযা রাখা অবস্থায় ঐ ক্যানসারের কোষ বা টিমার আর বাড়তে পারে না এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ঐ ক্যানসারের কোষ বা টিমার আস্তে আস্তে ধ্বংস হয়ে যায়।এই সম্পর্কে আরও স্পস্ট ধারনা পাওয়া যায় রমজান নিয়ে গবেষনা করে যে ২০১৬ সালে নবেল জয়ী হয়েছিলেন সেই জাপানী গবেষক ওশিনরির Autophagy বা Autophagocytosis – এর ত্বত্ত থেকে। Auto মানে Automatic, Phago মানে ভক্ষন করা বা খাওয়া, cyto মানে কোষ – অথ্যাৎ সয়ংক্রিয়ভাবে ভাবে কোষ কোষকে ভক্ষন করা বা খাওয়া। এই ত্বত্ত অনুযায়ী উপবাস বা রোজার সময় আমাদের শরীরের সক্রিয় কোষগুলো নিষ্ক্রিয় থাকে না। সক্রিয় কোষগুলো সারা বছরে তৈরি হওয়া ক্ষতিকারক (ক্যানসারের কোষ) আর নিষ্ক্রিয় কোষগুলোকে খেয়ে ফেলে শরীরকে নিরাপদ আর পরিষ্কার করে দেয়। এটাই ‘Autophagy’। অটোফেজি আবিষ্কারের পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের বা ধর্ম মানে না কিন্তু স্বাস্থ্য সচেতন এমন অনেক মানুষ সারা বছরে বিভিন্ন সময় ‘অটোফেজি’ করে শরীরকে সুস্থ রাখেন।

গবেষনায় আরো দেখা গিয়াছে যে ক্যানসারের আক্রান্ত রোগীরা যদি রোযা বা উপবাস অবস্থায় ক্যামোথ্যারাপি নেয় তবে ক্যামোথ্যারাপির কার্যকারিতা রোযা না রাখার অবস্থার চেয়ে অনেক বেশী কার্যকরী হয়।

পরিশেষে এই বলে শেষ করতে চাই – বৎসরে ১ মাস রোযা রাখার কারণে মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের বিশ্রাম ঘটে। মাঝে মাঝে বিশ্রাম দিলে কারখানার মেশিন যেমন অনেকদিন টেকসই হয়, তেমনি রোযার ফলে মানবদেহের নানা যন্ত্রপাতির আয়ু বৃদ্ধি পায় এবং রোগ-শোক কম হয়। খেজুর গাছের রস বৃদ্ধি ও মিষ্টির জন্যে গাছী কয়েকদিন বিরতি দিয়ে খেজুর গাছে হাড়ি বাঁধে। রোযা বা উপবাস মানুষের জীবনে সুখ আনে, জীবনে আনে নতুন ছন্দ-গতি।

লেখক

লেকচারার ডা: মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম

আনসার হোমিও কমপ্লেক্স

ডি.আই.টি, নারায়নগঞ্জ

মোবাইল : 01912074922

৭৫
0