টক অব দ্য টাউন: বাদীর পাশেই আসামী, রহস্য উদঘাটন কী সম্ভব?

0

শহরের দেওভোগ থেকে নিখোঁজ হওয়া দেড় বছরের শিশু সাদমান সাকি নিখোজের ঘটনায় শিশুটির পিতা ওমর খালেদ এপন তার ছোট ভাই সৈয়দ সাদিম আহমেদকে সাথে নিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদানের পর দেওভোগ এলাকা সহ পুরো শহরজুড়ে শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়। সেই সাথে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র ক্ষোভের।

এই সমালোচনা ও ক্ষোভের কারন এপনের পাশে থাকা শিশুটির আপন চাচা, এপনের ছোট ভাই সাদিম আহমেদ।

কেননা, শিশু সাদমান সাকি ইস্যুতে বিভিন্ন সময় ঘটনাটি নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সকল গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে ইতিপূর্বে এ প্রতিবেদকের সাথে খোলমেলা আলোচনায় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানারএক কর্মকর্তা অকপটেই স্বীকার করেছেন শিশু সাদমান সাকি নিখোজের মামলাটি একেবারেই দ্বারপ্রান্তে আসার পর মামলার বাদী নিজেই মামলাটি আর পরিচালনা করতে চান না বলে তার ভাইকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নেয়।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর দুপুরে দেওভোগ এলাকা থেকে অপহৃত হয় সৈয়দ ওমর ফারুক এপনের ছেলে সাদমান সাকি । এই ঘটনাটি অধিক গুরুত্ব দিয়ে আলফা ওয়ান (পুলিশ সুপার স্যার) নিজেই শিশুটির বাড়ীতে যান এবং কঠোর হস্তে তদন্ত করার আদেশ দেন। সে মোতাবেক শিশুটিকে উদ্ধার করতে দারোগা শামীম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো। ডিসেম্বর ২৬ তারিখে ওসি শাহিন শাহ পারভেজের সাথে আলফা ওয়ানের ভূল বোঝাবুঝির কারণে গোলমেলে অবস্থার সৃষ্টি হয় থানায়। ওসির দায়িত্ব তখন পালন করছিলেন তদন্ত আবদুর রাজ্জাক। এই সময় শিশু সাকির বাবা খবর দিলো তার বাচ্চাকে ফেরত পেতে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপন দাবী করে ফোন করেছে অজ্ঞাত ব্যাক্তি। তার যে অপহরণকারী তার প্রমাণ হিসেবে পরদিন সকালে তার বাচ্চার পায়ের জুতা এপনের বাসার সামনে ফেলে যাবে। অপহরণকারীর কথামতো বিকাশের মাধ্যমে ৪৫০০ টাকাও পাঠানো হলো । টাকা পাঠানার পর দিন সকালে সাকির পায়ের জুতা এপনের বাসার সামনে ফেলে যায়।

তারিখ উল্লেখ না করে ওই কর্মকর্তা বলেন, এরপর আবারো ফোন করে করে শিশু সাকিকে মুক্তিপন বাবদ ৫ লাখ টাকা দাবী করে । নইলে পরদিন বাচ্চার পরিহিত জামা আবার বাসার সামনে ফেলে যাবে বলে হুমকিও দেয় (এপনকে)। অপহরণকারীর কথা মতো ফের সকালে ঘুম থেকে উঠে সাকির বাবা মা সাকির জামা কাপড় তার দরজার সামনে দেখে হতবাক হয়ে পরে ।

এমন খবরে তৎপর হয়ে উঠে পুলিশ। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরহরণকারীর অবস্থান পাওয়া যায় মামলার বাদি এপনের বাসার সাথেই। বারবার চেষ্টার পর মোবাইল ট্রেকিং করে পাওয়া যায় অপহরণকারী অন্য কেউ না তার আপন চাচা সাদিম আহমেদ। সেই মোতাবেক আটক করে আনা হলে মামলার বাদী সৈয়দ ওমর খালেদ এপন নিজেই তার ভাই সৈয়দ সাদিম আহমেদকে ছাড়াতে তৎপর হয়ে উঠে। থানায় ঘুরঘুর করতে থাকে সাদিমকে ছাড়ানোর জন্য। দারোগা শামীম ও আমার কাছে নানা ভাবে আকুতি করতে থাকে ।

এপনের আকুতি উপেক্ষা করে দারোগা শামীম ও আমি অপহরণ মামলার আসামী ও মোবাইলে মুক্তিপন দাবীকারী এবং সাড়ে ৪ হাজার টাকা বিকাশের মাধমে গ্রহণকারী সৈয়দ সাদিম আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলেই অচেতন হয়ে পরার অভিনয় করতে থাকে । অপরদিকে মামলার বাদী এপনের থানায় সার্বক্ষনিক অবস্থানের কারণে ঠিক মতো জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারছি না । রাতের এক পর্যায়ে সৈয়দ সাদিম আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেলে সে অচতন হয়ে পরে। আমরাও নাছোরবান্দা যে কোন উপায়ে শিশুকে উদ্ধার করতেই হবে। সে দিক বিবেচনা করে সৈয়দ সাদিম আহমেদকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই চিকিৎসা করাতে। তৎকালীন সময়ের চিকিৎসক সাদিমকে পর্যবেক্ষন করে কোন ওষুধ না দিয়ে বলেন, সাদিম সম্পূর্ণ সুস্থ্য সে অভিনয় করতেছে ।

এ সময় খবর পেয়ে আবার অপহৃত শিশু সাকির বাবা এপন পুলিশকে জানান, “আমার ছেলে হারাইছি, এখন আর ভাইকে হারাতে চাই না ”

এপনের এমন জোড়াজুড়িতে তৎকালীন সময়ের সদর থানার দায়িত্বরত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমতিক্রমে হাতের নাগালে অপহরণকারীকে পেয়েও ছেড়ে দিতে হয়েছে বাদীর আপত্তির কারণে। এক্ষেত্রে পুলিশ অথবা অন্য কাউকে দোষারোপ করার কোন সুযোগ নাই মামলার বাদী এপনের।

এদিকে, শিশুটি উদ্ধারে প্রশাসনের ব্যার্থতার কারনে বিষয়টি ক্রমশই জটিল আকার ধারন করছে বলে অভিযোগ করছেন অনেকে।

একে তো শিশুটির পরিনতি কি হয়েছে বা কোথায় আছে সেটা জানতে না পেরে নারায়ণগঞ্জের জনগনের মাঝে তাদের শিশু সন্তানদের নিয়ে আতংক বাড়ছে। তার উপর শিশুটির পিতা সমাজের এমন কিছু ব্যাক্তিকে অভিযুক্ত করেছেন যা কিনা বিরাট প্রশ্নের সষ্টি করেছে। উপরন্ত, মোবাইল নাম্বার অনুযায়ী শিশুটি অপহরনের অভিযোগে পুলিশ যাকে গ্রেফতার করেছিলো সেই সাদিমকে সাথে নিয়ে এপনের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার ঘটনায় জনগনের মনে জেগেছে বিশাল প্রশ্ন।

‘আসামীই যখন বাদীর ভূমিকায়, তখন কি রহস্য উদঘাটন করা আদৌ সম্ভব?’

এদিকে দেওভোগবাসী মনে করেন, সাকি নিখোঁজের ঘটনায় এ মুহূর্তে তার আপন চাচা সাদিম আহমেদকে পুলিশ কাস্টাডিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিৎ। পাশাপাশি এপন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য কোনো নাটক সাজিয়েছেন কিনা সেই প্রশ্নও উঠেছে। তবে কে কি বলছেন সেটার চেয়েও বড় কথা হলো শিশু সাদমান সাকি নিখোঁজ রহস্য উৎঘাটন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রশাসন এই রহস্য উদ্ধারে ব্যার্থ হলে আগামী দিনে এই ইস্যুটি যে শহরের আরো একটি বড় ইস্যু হিসাবে চলে আসবে এতে অনেকেরই কোনো সন্দেহ নেই। ফলে পরিস্থিতি আরো জটিল হওয়ার আগেই সবার আগে প্রয়োজন সাকির চাচা সাদিমকে গ্রেফতার করে পুলিশ কাস্টডিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং শিশুটির নিখোঁজ রহস্য উৎঘাটন করা।

তবে, সুযোগ্য বর্তমান পুলিশ সুপার অনেক কঠিন কাজকেও সহজ করছেন। সবার প্রত্যাশা তার দ্বারাই সম্ভব অন্ধকার থেকে এই মামলার আলোয় আনতে।

 

(সূত্র: দৈনিক আগ্রবানী)

২৭৮
0