নানা রকম সংকটে ধুঁকছে ঢাকা-না.গঞ্জ রেল

0

কামাল উদ্দিন সুমন, লাইভ নারায়ণগঞ্জ: নানা রকম সংকটে ধুঁকছে দেশের প্রাচীনতম ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল। ১৬ কিলোমিটার দুরত্বের এপথে যাত্রীর কোন কমতি নেই কিন্তু কাঙ্খিত সেবাও নেই । শুধু তাই নয় দুর্ভোগ যেন এ পথের যাত্রীদের নিত্যসঙ্গি। ঢাকা-নারায়নগঞ্জ রেল রুটটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এক সময় রেলেই প্রধান যোগাযোগ ছিল বানিজ্যিক নগরী নারায়ণগঞ্জের সাথে। ১৮৮৪ সালের ৪ জানুয়ারি এই পথে রেল যোগযোগ শুরু হয়। এরই মধ্যে কেটে গেছে ১৩৫ বছর। তবে সেবার মান বাড়েনি।

সূত্র জানায়, প্রতিদিন চাকুরিজীবি, ব্যবসায়ী ও ছাত্রসহ কয়েক হাজার মানুষ এ রুটে যাতায়াত করেন। কিন্তু রেলের ভাঙ্গা সিট, কোচের স্বল্পতা, পর্যাপ্ত আলোর অভাব, ফ্যান ও পয়ঃব্যবস্থাপনা না থাকা, মহিলা বগিতে কম সংখ্যক আসন, পুরাতন লোকোমোটিভ ও মেয়াদ উত্তীর্ণ কোচ এবং নিয়মিত লাইন মেরামত না করায় প্রতিদিন যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে রয়েছে সিডিউল বিপর্যয়, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সমস্যা ও যাত্রী ভোগান্তি।

জানা যায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে প্রতিদিন মোট ১৬ বার দুটি ট্রেন চলাচল করে। যার সময়সীমা ৪০ মিনিট। তবে সম্প্রতি কোনো ট্রেনই তার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্লাটফর্মে পৌছায় না। সরেজমিনে দেখা যায়, ৪০ মিনিটের স্থানে প্রতিটি ট্রেন গন্তব্যে পৌছাতে সময় নিচ্ছে ১ ঘন্টা থেকে ১ ঘন্টা ২০ মিনিট।

সূত্র জানায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জনবল সংকট। যা রেলের সব সমস্যার সৃষ্টির মূল কারণ। রেলের সূত্রমতে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে স্টেশন রয়েছে ৬ টি। নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় স্টেশন, চাষাঢ়া স্টেশন, ফতুল্লা স্টেশন, পাগলা স্টেশন, গেন্ডারিয়া স্টেশন ও ঢাকা স্টেশন। নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় স্টেশনে স্টেশন মাস্টার ৪ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে সেখানে স্টেশন মাস্টার আছেন ২জন, চাষাঢ়া স্টেশনে ৩ জনের পরিবর্তে ২ জন, ফতুল্লা স্টেশনে ৩ জনের পরিবর্তে ২ জন, গেন্ডারিয়া স্টেশনে ৩ জনের পরিবর্তে আছেন ২ জন। প্রিম্যান বা পয়েন্টস ম্যান রয়েছেন ৬ জনের পরিবর্তে ৩ জন, বুকিং সহকারী ৩ জনের পরিবর্তে ২ জন এবং অফিস সহকারী ৩ জনের পরিবর্তে ২ জন।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ৬ জন টিটির পোস্ট থাকলেও সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়নি একজনকেও। যার ফলে প্রতিদিন বিনা টিকেটে যাতায়াত করছে হাজারো যাত্রী। যার কারণে প্রতিমাসে লোকসান গুণতে হচ্ছে রেল বিভাগকে। আগে যেখানে প্রতিদিন ৫ হাজার টিকিট বিক্রি হতো এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে এমনটাই জানালেন রেল সংশ্লিষ্টরা।

রেল সূত্র জানায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে চলাচলকারী প্রতিটি ট্রেনের ইঞ্জিন পুরনো এবং মেয়াদোত্তীর্ণ। বর্তমানে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী ট্রেনের ইঞ্জিন ২০ বছর আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। আর এই মেয়াদোত্তীণ ইঞ্জিন ব্যবহারের কারণে কমেছে ট্রেনের গতি।

ট্রেন চালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, বর্তমানে ব্যবহৃত ট্রেনের ইঞ্জিনগুলো নতুন অবস্থায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম ছিল। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে বর্তমানে ট্রেনগুলো সর্বোচ্চ ৫০ মিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে।

নিয়ম অনুযায়ি রেল লাইনের ৪০ মিটারের মধ্যে কোনো স্থায়ী, অস্থায়ী স্থাপনা থাকবে না। কিন্তু ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল পথের সর্বত্রই বিভিন্ন স্থাপনা দিয়ে ঘেরা। যার অধিকাংশ রেল লাইনের গা ঘেষে রয়েছে। নগরীর ২নং রেল গেট থেকে ১নং রেল গেট পর্যন্ত সম্পূর্ণ রেল পথের দুই পাশ বিভিন্ন অস্থায়ী দোকানে ঘেরা। একইভাবে ফতুল্লা রেলস্টেশনের আশেপাশেসহ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের অধিকাংশ অংশে অবৈধ স্থাপনা।

সূত্র জানায়, যাত্রীদের বড় ভোগান্তি হচ্ছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল পথের ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়া। অনেকটা পান থেকে চুন ঘষতেই এখন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল পথের ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবেই বিকল হয়ে পড়ে থাকে।

গত ৮ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১২টায় কেন্দ্রীয় রেল স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া ঢাকাগামী ট্রেনটি ২নং রেল গেইটের ক্রসিংয়ে বিকল হয়ে পরে। এতে করে চাষাঢ়া থেকে নিতাইগঞ্জগামী ও নিতাইগঞ্জ থেকে চাষাঢ়াগামী রাস্তার উভয় লেনে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পর ট্রেনের ইঞ্চিন মেরামত করার পর আবারও ট্রেন চলাচল শুরু হয়। একই ভাবে গত বছর ২৭ অক্টোবর দুপুর ২টার দিকে কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ডেমু) ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয় । এর আগে গত ১২ অক্টোবর শহরের ১নং রেল গেইট এলাকায় বোস কেবিনের সামনে ইঞ্জিন বিকল হয়ে আটকা পড়ে। এতে দুই ঘন্টা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। গত ১৫ অক্টোবর ১২টা ২০ মিনিটে কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা ট্রেন দুপুর ১টা ৭ মিনিটে চাষাঢ়া স্টেশন ত্যাগ করে কেন্দ্রীয় স্টেশনে যাওয়ার পথে ঢাকা-পাগলা-নারায়ণগঞ্জ সড়কের লেভেল ক্রসিংয়ে বিকল হয়ে পড়ে।

এদিকে সংকটের কোন সুরাহা না হওয়ায় এরুটের একসময়ের ইজারদার মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই বছর আগেই গতবছর আগষ্ট মাসে রেল পরিচালনায় অপারগতা প্রকাশ করে সরকারের কাছে ১৩ জোড়া ২৬টি ট্রেন হস্তান্তর করে। অব্যাহত লোকসানের পাশাপাশি তারা নানা সমস্যা সমাধানের জন্য বারবার তাগিদ দেয়ার পরও কোন সুরহা না হওয়া ইজারা ছেড়ে দেয় ঐ কোম্পানী ।

রেলের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়, সরকারিভাবে চলাচলের আদেশ (প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার (পূর্ব) স্মারণ নং-৫৪.০১.১৫০০.১০৭.১৮.০০২.১৪) মূলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের ১৩ জোড়া (দুই রেক) লোকাল ট্রেন প্রাইভেট অপারেট থেকে রেলওয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নেয়া হয়। ইজারা গ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ট্রেনগুলো পরিচালনায় অপারগতা দেখালে ২৬ আগস্ট ২০১৯ থেকে কার্যকরের জন্য সব দফতরে জানিয়ে দেয়া হয়।

ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এস আর ট্রেডিং এর স্বত্তাধীকারী মো. সালাউদ্দিন রিপন তখন জানিয়েছেন , স্বল্প দূরত্বের হলেও ঢাকার যানজট-সহ নানান কারণে এসব ট্রেন হলেও গুরুত্বপূর্ণ চাহিদামত পর্যাপ্ত কোচ সরবরাহ দিতে না পারা, ইঞ্জিন বিকল-সহ একই রুটে রেলের নিজস্ব ৩টি কমিউটার ট্রেনের কারণে ব্যবসায়িক ভাবে ট্রেনগুলো পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য রেলের সাথে চুক্তির শর্তানুসারে, ২৬ আগস্ট থেকে ট্রেনগুলো রেলের কাছে হস্তান্তর করেছে।

নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় স্টেশন মাস্টার গোলাম মোস্তফা এরুটে রেলের সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, টিটি না থাকায় যাত্রী টিকেট চেক করা সম্ভব হয় না। ফলে আগে যেখানে ৫ হাজার টিকিট বিক্রি হতো তা আড়াইহাজারে নেমে এসেছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে যে ইঞ্জিন দিয়ে এই পথে ট্রেন চলাচল করছে এগুলো আরো ২০বছর আগে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদ শেষ হওয়া ইঞ্জিন দিয়ে আমাদেরকে সার্ভিস দিতে হচ্ছে। যে কারণে ঘন ঘন ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাচ্ছে। তবে ২০২১ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে নতুন ইঞ্জিন সংযুক্ত করা হবে। তখন নারায়ণগঞ্জে চলাচলকারী ইঞ্জিনগুলো পরিবর্তন করা হবে।

গোলাম মোস্তফা বলেন, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ রেলের জন্য নতুন বগির বরাদ্দ নেই। তবে ডাবল লেন হবার পর তা হবে। যাত্রী সংখ্যা বেশি আর শৌচাগার কম থাকায় তা অধিকাংশ সময় নোংরা থাকে। তিনি আরো বলেন,রেলের সঙ্গে জড়িত সকল নিরাপত্তা রেল পুলিশের দায়িত্ব। একইভাবে ট্রেনের ছাদে যাত্রী উঠা রোধের বিষয়টিও তাদের তত্বাবধানে। ফলে এ বিষয়ে আমাদের তেমন কিছু করার নেই।

তিনি আরো বলেন, ডাবল রেল লাইন প্রকল্পের কাজের জন্য এখন ট্রেন চলাচলে একটু সমস্যা হচ্ছে। যে কারণে ১০-১৫ মিনিট দেরি করে ট্রেন আসছে। ডাবল রেল লাইন প্রকল্পের কাজ শেষ হলে তখন ২০ মিনিটে যাতায়াত করা যাবে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল পথের চিত্র একেবারে পাল্টে যাবে।

0