না.গঞ্জের মাদরাসা গুলো কেন বন্ধ হয়নি?

0

স্টাফ করেসপন্ডেট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ: করোনায় আতঙ্কে সারা বিশ্ব। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শিক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অর্থনীতির চাকায় পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। জনমনেও তৈরি হয়েছে এক ভীতিকর পরিস্থিতি। এবিষয়ে বিভিন্ন দেশের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও নেয়া হয়েছে নানাবিধ পদক্ষেপ।

মরণঘাতী করোনা ভাইরাস আতঙ্কে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এ তথ্য জানিয়েছেন। একইসঙ্গে দেশের সব কোচিং সেন্টার বন্ধের নির্দেশ দেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

ইতিমধ্যেই করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতায় বন্ধ হয়ে গেছে নারায়নগঞ্জসহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু, নারায়ণগঞ্জ শহরের মাদরাসাগুলোতে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ। সরেজমিনে দেখা যায় শহরের মাদরাসা গুলোতে পূর্বের নিয়মেই চলছে পাঠদান কার্যক্রম। আবাসিক থেকে অনাবাসিক সকল পর্যায়ের ছাত্ররাই উপস্থিত রয়েছেন মাদরাসাগুলোতে। ছাত্ররাও জানেন না, সরকারীভাবে ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়েছে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাদের মধ্যে নেই কোন প্রকারের সচেতনতার ছোঁয়াও। প্রতিষ্ঠান পরিচালকরা বলছেন, ক্লাস বন্ধ করতে বলা হয়েছে মাদরাসা না।

এবিষয়ে চাষাড়া নবাব সলিমুল্লাহ রোডের দারুল উলুম বাগে জান্নাত মাদরাসার শিক্ষা সচিব আব্বাস উদ্দিন বলেন, কওমি মাদরাসা বোর্ড থেকে ক্লাস বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হলেও মাদরাসা বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়নি। আগামী ২৮মার্চ থেকে ৪এপ্রিল বার্ষিক পরীক্ষা রয়েছে, এরপরই বন্ধ হয়ে যাবে মাদরাসা। সেজন্য এখন বন্ধ দেয়া হয়নি।

এবিষয়ে আরও জানার জন্য জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত মাদরাসার শাইফুল হাদিস এর কাছে যাওয়া হয়। মুফতী মুহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, আমরা সরকারের নির্দেশনা অবশ্যই মেনে চলবো। যেহেতু, ছোটদের ঝুঁকি কম তাই তাদের যেতে দেয়া হয়নি। বড়দের ছুটি দেয়া হয়েছে। ছোটদের দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা তসবিহ তাহলিল করানো হয় এবং তাদের উন্নতির লক্ষ্যে পাঠদান পরিচালনা করা হচ্ছে।

এবিষয়ে মাদরাসার মাঝারি বয়সের এক ছাত্র জানান, তাদের কোন প্রকার বন্ধের কথা জানানোও হয়নি। এমনকি তার কোন বন্ধুও ইতিমধ্যে বাসায় যায়নি। পূর্বের নিয়মেই চলছে তাদের কার্যক্রম।

তবে, সরেজমিনে বাগে জান্নাতে দেখা যায় সব ধরনের ছাত্রদের উপস্থিতিই ছিল মাদরাসাটিতে। মাদরাসার মক্তব বিভাগেও চলছিল পাঠদান কার্যক্রম। মসজিদের দ্বিতীয় তলাও চলছিল বড়দের কোরআন তিলাওয়াত। আবাসিক ছোট ছাত্রদের রুমে প্রবেশ করে ৪০জন ছাত্রের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়।

একই অবস্থা দেখা যায়, উত্তর চাষাড়ার একেএম শামসুজ্জোহা রোডের মারকাজু দাওয়াতিল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায়। গদবাধা ভাবে পড়ানো হচ্ছে ছাত্রদের। ছোট থেকে মাঝারি বয়সের ছাত্রদের আগের নিয়মেই পড়ানো হচ্ছে। কেউ জানেনও না তাদের স্কুল সহপাঠিরা করোনা ভাইরাস সচেতনতায় অবস্থান করছে নিজ গৃহে। বন্ধ রয়েছে তাদের সহপাঠিদের পাঠদান কার্যক্রম।

কেন সরকারি নির্দেশনার পরও খোলা রাখা হয়েছে প্রতিষ্ঠান? জানতে চাওয়া হয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের কাছে। পরিচালক হাফেজ মাওলানা রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, কওমি বোর্ডের নির্দেশনায় চলছে প্রতিষ্ঠান। বোর্ড থেকে ক্লাস বন্ধ করার কথা বলা হলেও, মাদরাসা বন্ধের কথা বলা হয়নি। তাই হোম কোয়ারেন্টাইনের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রস্ততি চালাচ্ছেন তারা। প্রতিদিন ফজর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলছে এই পাঠদান কার্যক্রম।

হোম কোয়ারেন্টাইনের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলা হলেও তাদের মাদরাসার ওয়াশরুমে ছিল না সাবানও।

 

মারকাজু দাওয়াতিল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায় চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো, ইতিমধ্যেই মাদরাসার দুই শিক্ষার্থী জ্বরে ভুগছেন। রেসপিরেটরি লক্ষণ ছাড়াও জ্বর, কাশি, শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যাই মূলত প্রধান লক্ষণ করোনা ভাইরাসের। গত ‍দুইদিন যাবত এই দুই ছাত্র জ্বরে ভুগছেন বলে জানা যায়। কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের বাড়িতে না দিয়ে এখানেই রেখে দেয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পরিচালক বলেন, তাদের অভিভাবকে বলা হয়েছে, তারা আসবেন।

এরপর যাওয়া হয়, আমলাপাড়া কে.বি.সাহা বাইলেনে অবস্থিত জামিয়াতুল আশরাফিয়া রহমতুল্লাহ মাদরাসায়। মাদরাসায় প্রবেশ করে দেখা যায়, আঙ্গিনা পরিষ্কারে ব্যস্ত ছাত্ররা। সবাই নিজ নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করছেন মাদরাসার আঙ্গিনা। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা যায়, করোনা ভাইরাসে সচেতন হয়েই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন তারা। একইসাথে অন্যদিকে চলছিল পাঠদান কার্যক্রম এবং সকল ছাত্ররাই উপস্থিত ছিলেন মাদরাসায়। ছোট ছাত্ররা ঘুমিয়ে ছিলেন এবং বড়রা কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন।

সরকারি নির্দেশের পর কেন এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়নি? এরকমই প্রশ্নের জবাব দেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মাওলানা আব্দুল কাদির। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানে সকল ক্লাস বন্ধ রয়েছে। কওমি বোর্ডের কাছে আমি প্রশ্ন করেছিলাম মাদরাসার ছাত্রাবাস কি খালি থাকবে? বোর্ড বলেছেন, যথাসময়েই যেহেতু পরীক্ষা হবে, যারা চলে যেতে চায় যাবে। আর যারা ছাত্রাবাসে থাকতে চায় তারা থাকবে। এছাড়াও তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে ৭০০ছাত্র থাকলেও সরকারের নির্দেশনার পর বর্তমানে ৩০০ছাত্র রয়েছে।

একইসাথে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ফতুল্লার বাংলাবাজার রোডে অবস্থিত দারুল আরকাম ক্বওমী মাদরাসা। উত্তর গোয়ালবন্দের কাশীপুর খিল মার্কেটে অবস্থিত মাদরাসাটিতে প্রবেশ করে একইরকম দৃশ্য চোখে পড়ে।

এব্যাপারে মাদরাসার পরিচালক হাফেজ জসিমউদ্দিন জানান, ক্লাস বন্ধ রয়েছে। বাচ্চারা যারা আছে তাদের দিয়েই চলছে পাঠদান কার্যক্রম।

সরকারের নির্দেশনা অমান্য করে, চোখ ফাকি দিয়ে চলা মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে কি নেয়া হবে না কোন ব্যবস্থা? এসকল মাদরাসায় পাঠদানরত শিক্ষার্থীদের জীবনের কোন মূল্য নেই সরকারের? সরেজমিনের দেখা এ ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার মো.শরিফুল ইসলামের কাছে।

শরিফুল ইসলাম বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন তাদের বাহিরে আর কিছুই বলার নেই। এরকমই আরও অভিযোগ তার কাছে রয়েছে। সরকারীভাবে প্রাথমিক থেকে শুরু করে সকল প্রকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি কোচিং সেন্টারও বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেখানে মাদরাসা এর বাহিরে নয়। সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসকের সহযোগীতায় পরবর্তীতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।

0