না.গঞ্জ হবে চুনকা নগরী!

প্রয়াত আলী আহাম্মদ চুনকা। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান। ১৯৭৪ সালে পৌর নির্বাচনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের প্রার্থী করেছিলেন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদখ্যাত প্রয়াত মহিউদ্দিন আহমেদ খোকাকে। বঙ্গবন্ধুর সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে তখন বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন শ্রমিক নেতা চুনকা। ২০১১ সালে সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচনে প্রধাণমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের প্রার্থী করেন জননেতা একেএম শামীম ওসমানকে। সেই নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হন চুনকা কন্যা সেলিনা হায়াৎ আইভী। মেয়র হওয়ার পর থেকে পিতা আলী আহাম্মদ চুনকার নাম স্মরণীয় করে রাখতে একের পর এক পদক্ষেপ নেন আইভী। এরই ধারাবাকিতায় সর্বশেষ বন্দরের প্রধাণ সড়কের নাম পরিবর্তন করে আলী আহাম্মদ চুনকা সড়ক করেন। মুছে দেন পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান মি. এইচটি উইলসন এবং নবাব ঈশা খাঁ’র পত্নী সোনাবিবির নাম। শহরে একটি সড়ক ও একটি মিলনায়তন ‘আলী আহাম্মদ চুনকার’ নামে থাকার পরও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের নাম মুছে পিতার নাম প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নগরবাসীর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন মেয়র আইভী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এনিয়ে চলছে সমালোচনার ঝড়। এরইমধ্যে খবর পাওয়া গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জেও একটি সড়কের নাম আলী আহাম্মদ চুনকা সড়ক করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ফলে অনেকেই বলছেন, তাহলে কি নারায়ণগঞ্জের নামও পরিবর্তন করে পিতার নামে রাখবেন মেয়র আইভী?
নগরবাসী জানায়, আলী আহাম্মদ চুনকা নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতিও ছিলেন। তাকে সম্মাণ দেখিয়ে ৯৬-২০০১ মেয়াদে সংসদ সদস্য থাকাকালে শামীম ওসমান দেওভোগের একটি সড়কের নামকরণ করেন আলী আহাম্মদ চুনকা সড়ক। এরআগে শহরের ডিআইটি এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় আলী আহাম্মদ চুনকা পাঠাগার ও মিলনায়তন। যেটি সভা সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কেন্দ্র বিন্দু হয়ে উঠেছিলো এক সময়। আইভী মেয়র হওয়ার পর সৈয়দপুরে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি সম্পত্তি জোরপূর্বক ভরাট করে সেখানে পিতার নামে আলী আহাম্মদ চুনকা ষ্টেডিয়াম করার চেষ্টা চালান। কিন্তু এলাকাবাসীর বাঁধার মুখে ব্যর্থ হন। পরবর্তিতে জিমখানায় রেলওয়ের সরকারী সম্পত্তি দখল করে পার্ক নির্মাণে হাত দেন। সেই পার্ক প্রথমে পিতা চুনকার নামে করার পরিকল্পনা করলেও দখলী সম্পত্তি হওয়ার কারণে এবং রেলওয়ের বাঁধা সমালাতে ভিন্ন কৌশল নেন, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজীব পার্ক নামকরণ করেন। পরে সেই নাম পরিবর্তণ করে সিটি শেখ রাসেল পার্ক নামকরণ করেন। রেলওয়ের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা করে সেই পার্কটি এখনো করে যাচ্ছেন মেয়র আইভী। এছাড়া শহরের ডায়মন্ড চত্বরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত ‘রহমতউল্লাহ মুসলিম ইনষ্টিটিউট’ ভবনটি আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভেঙ্গে দেয় সিটি কর্পোরেশন। সেখানে ‘চুনকা চত্বর’ করার পরিকল্পনা করেছিলেন মেয়র আইভী। বিতর্কিত এই কান্ড করে পিতার নাম দিলে ইমেজ ক্ষুন্ন হবে, তাই এখানেও আবার কৌশল অবলম্বন করেন। অবশেষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামে ‘বঙ্গবন্ধু চত্বর’ নামকরণ করেন আইভী।
এরইমধ্যে বন্দর তথা শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড়ে প্রধাণ সড়কটির নাম ছিলো উইলসন রোড। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। পুরো নাম মি. এইচ টি উইলসন। ১৮৭৬ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর পৌরসভা ঘোষণার পর প্রথম পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। সেই মি. উইলনের নামের সড়কের নাম পরিবর্তণ করে নতুন নামকরণ করা হয়েছে আলী আহাম্মদ চুনকা সড়ক। পরিবর্তিত নামে সম্প্রতি স্থাপণ করা হয়েছে পাকা সাইনবোর্ড।
শহরের ডিআইটিতে পিতার নামের আলী আহাম্মদ চুনকা পাঠাগার ভেঙ্গে আধুনিক মিলনায়তন করার জন্য ৩ কোটি টাকা টেন্ডার সম্পন্ন করেন। পরবর্তিতে যার খরচ কয়েক দফায় বাড়িয়ে ২৬ কোটি টাকা করা হয়। শুধু তাই নয়, ডিআইটির বিশাল ফুটপাত দখল করে পিতার নামে করা মিলনায়তনের সৌন্দর্য বর্ধণ করেন। এনিয়ে নারায়ণগঞ্জ জুড়ে সমালোচনার ঝড় বইলেও থেমে থাকেননি আইভী।
শহর, বন্দরের পর এবার সিদ্ধিরগঞ্জে পিতার নাম প্রতিষ্ঠিত করতে একটি সড়কের নাম আলী আহাম্মদ চুনকা সড়ক করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে, এবিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী বিভাগ কিছু জানে না বলেছেন।
মেয়র আইভী তার পিতার নাম প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক নামকরণ করায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে নগরীজুড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই মন্তব্য করছেন, যেভাবে নামকরণ শুরু করেছেন আইভী, তাতে অদূর ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নাম পরিবর্তণ করে ‘চুনকা নগরী’ নামকরণ করে ফেলতে পারেন!