বন্দরে মতবিনিময়ে ডিসি ‘আমার টিম হবে আলোকিত, না.গঞ্জকে এগিয়ে দিতে চাই’

0

লাইভ নারায়ণগঞ্জ : বন্দর উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, শিক্ষক, ইমাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাথে মতবিনিময় সভা করেছেন জেলা প্রশাসক(ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহ।

২৬ জানুয়ারী (মঙ্গলবার) দুপুরে উপজেলা পরিষদের অডিটরিয়ামে এ সভার আয়োজন করা হয়।

বন্দর উপজেলা পরিষদে উপস্থিত হয়ে জেলা প্রশাসক ও বন্দর উপজেলার নির্বাহী অফিসার(ইউএনও) শুক্লা সরকার বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ করেন। এরপর উপজেলা পরিষদ ভবনের বঙ্গবন্ধু কর্নার পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন জেলা প্রশাসক। এসময় বন্দর উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সাংবাদিক, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত হয়ে মতবিনিময় করেন। সভা শেষে জেলা প্রশাসক হাতে একটি সম্মাননা স্মারক তুলে দেন বন্দর উপজেলা নির্বাহী অফিসার।

এছাড়াও বন্দর উপজেলা প্রশাসন থেকে দুই প্রতিবন্ধীকে হুইল চেয়ার ও দশজন ভিক্ষুককে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা স্বরূপ একটি করে টি-স্টলের বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রীসহ নানা উপকরণ প্রদান করা হয়।

বন্দর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শুক্লা সরকার বলেন, ‘বন্দরে ১৮৩ জন ভিক্ষুক ছিল এর মধ্যে ৬০ জনকে আমরা পুনর্বাসিত করতে পেরেছি। বিভিন্নসময়ে তাদের টং দোকান, হাঁস-মুরগি, ওয়েট মেশিন দিয়ে সহায়তা করেছি’।

বন্দরের বিভিন্ন সমস্যার কথা জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইউএনও শুক্লা বলেন, ‘বন্দরে আসার পথে নবীগঞ্জে দিয়ে একটি ব্রিজ হলে নারায়ণগঞ্জের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক ভালো হবে। এখানে শীতলক্ষ্যা সেতু হচ্ছে, যেটি ২০২১ থেকে ২২ সালের মধ্যে শেষ হবে। আমাদের উপজেলায় আসার পথে একটিই কানেকটিং রোড আছে, মদনগঞ্জ থেকে মদনপুর পর্যন্ত। শীতলক্ষ্যা ব্রিজ যখন খুলে দেয়া হবে, তখন এই রোডটির উপর অনেক প্রেসার আসবে। বন্দর হয়ে যারা চিটাগাং যাবে, সেই সব পরিবহনের প্রেসার বাড়বে। এই রাস্তাটার বিষয়ে একটু লক্ষ্য দিবেন স্যার। লাঙ্গলবন্দে বাইপাস রোড করতে পারলে সেখানকার প্রেসারটা একটু কমতে পারে। আমার উপজেলার প্রবেশ পথে হাতের ডান দিকে কিছু ময়লা আবর্জনা আপনি দেখেছেন স্যার, যেটা সিটি কর্পোরেশনের ওইখানে হয়। আমি আসার পর এ বিষয়ে মেয়র ও এমপি স্যারকে অবগত করেছি, আমি চিঠিও দিয়েছি। কারণ, এই একটা রোড দিয়েই আপনি, আমাদের এমপি মহোদয়, বড় বড় স্যার, শীতলক্ষ্যা সেতুর যে কাজ হচ্ছে সেখানে আগত বিদেশী কোম্পানীর লোকজন আসে। বিদেশীরা যখন এই রাস্তা দিয়ে আসে, বাইরের দেশে গিয়ে বাংলাদেশকে নোংরা প্রেজেন্ট করে, তারা বন্দরকে নয়। আপনার মাধ্যমে অনুরোধ এই আবর্জনার একটা ব্যবস্থা করেন, যাতে আমাদের মানসম্মান থাকে’।

সাংবাদিকদের পক্ষে বন্দর প্রেসক্লাবের সভাপতি মোবারক হোসেন কমল খান বলেন, ‘আমরা শুনে এসেছি মদনগঞ্জের শান্তির চরে ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পার্ক হবে, বেপজা থেকে একোয়ার করা হয়েছিল, কিন্তু এখনও কোন অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। বন্দরে প্রায় ৭লাখ অধিবাসী রয়েছে। একটি ব্রিজ আমাদের মদনগঞ্জ দিয়ে হচ্ছে, সেটার মেয়াদ ২০ জানুয়ারী শেষ হয়ে গিয়েছে, পরবর্তীতে মেয়াদ আরও ৬ মাস বাড়ানো হয়েছে। নবীগঞ্জ ঘাটে ফেরীর ব্যবস্থা করে সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আমাদের ব্রিজ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। আমার দাবি নবীগঞ্জ দিয়ে যেন একটি ব্রিজ করা হয়। শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ লোক পারাপার হয়। কিন্তু তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে। এই কারণে ঝুঁকি, আমরা প্রায়ই দেখি সন্ধ্যার পর বাল্কহেড বোট বেপোয়ারাভাবে চলাচল করে। আমার দাবি সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত বাল্কহেড বোট ও পরিবহনের জাহাজ যাতে শীতলক্ষ্যায় চলাচল বন্ধ থাকে। ২০২০ সালে সাংবাদিক ইলিয়াসকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে, সেজন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, জেলা প্রশাসকের কাছে দাবি ইলিয়াসের পরিবারের জন্য কিছু করবেন। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি মদনপুর হাইওয়ে রোডে প্রায়ই দূর্ঘটনা ঘটে, এখানে একটি ওভারব্রিজ করার ব্যবস্থা হলে সড়ক দূর্ঘটনা কমবে’।

সভায় আরও অন্যান্যদের বক্তব্য শেষে প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক(ডিসি) মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘আপনাদের সমস্যাগুলোর বিষয়ে আমি নোট নিয়েছি। প্রথমদিনেই আমার মনে হয়েছে ব্রিজটা হওয়া দরকার, বাইপাস সড়ক হওয়া উচিত। ময়লা আবর্জনার কথা বলা হয়েছে। আসলে টোটাল নারায়ণগঞ্জেই ময়লা আবর্জনা আছে। যানজট ও ময়লা আবর্জনার জন্য কর্মপরিকল্পনা নিয়ে রিডিউস করার চেষ্টা করবো। বন্দরের টিমটি অত্যন্ত যোগ্য ও সুন্দর। বন্দরসহ নারায়ণগঞ্জে যারা কাজ করেন অন্যান্য উপজেলায়, তারা সরকারের কাছে পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত। আমাদের উচিত সরকারের সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দেয়া’।

নিজের পরিবার প্রসঙ্গে ডিসি মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘আমি শিক্ষক পরিবারের সন্তান। আমার ‘মা’ প্রাইমারী স্কুলের টিচার, ‘বউ’ সেও কলেজের টিচার, আমার বাবাও টিচার ছিলেন, ছোট ভাইয়ের বউও টিচার, আমার বোন প্রাইমারী স্কুলের টিচার। বীরমুক্তিযোদ্ধা ও টিচার যারা আছেন, তারা সমাজ ও বন্দর পরিবর্তনে অন্যতম হাতিয়ার’।

টিম নারায়ণগঞ্জ হবে বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত মন্তব্য করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমাকে সরকার পাঠিয়েছে কাজ করার জন্য, আমিও এসেছি কাজ করার জন্য। শাসক ও কিংবা প্রশাসক হিসেবে নয়। নারায়ণগঞ্জকে দেবার জন্য আমার ক্ষুদ্র প্রেয়াস থাকবে। বিশ্বাস করি আমার আয়ু কমে যাচ্ছে। কারণ আমাকে কোন না কোন সময়ে চলে যেতে হবে। নির্দিষ্ট সময়েই আমি বন্দরকে, সম্পূর্ণ নারায়ণগঞ্জকে এক ধাপ এগিয়ে দিতে চাই। আমাদের ফিলোসোফি, ১০টা পলিথিন থাকলে ১টা পলিথিন কমিয়ে দেয়া। যদি ১০টা ডাস্টবিন থাকলে ১টা কমিয়ে দেয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে চাই। আমরা সুন্দরী বউয়ের চোখ কানা চাই না।

তিনি আরও বলেন, যারা গর্ভমেন্টকে এগিয়ে দেবে, মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে দেবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাস্তবায়নের জন্য একটু অন্তরে হাত রাখবেন, সারাদিন শেষে বেতনটা ঠিক নিচ্ছি তো? যিনি উপজেলা-ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সচিব, আমি সম্মানিটা ঠিক মতো নিচ্ছি তো? যদি ভিতর থেকে আসে ঠিক আছে, তাহলে ফাইন। আর যদি বলে, আরেকটু কাজ করো, তাহলে আরেকটু কাজ করেন। সময় কিন্তু পাবেন না। কেউই সময় বেশি পাবেন না, সেটি জীবনের হোক আর চাকরির হোক। প্রত্যেককের ফোন ধরতে হবে। জনগণকে কাছে আসতে দিতে হবে। সবাই একটু ভালো ব্যবহার করবো। আমরা অনেক লোডে থাকি, আমাদের কর্মকর্তা কর্মচারী জনপ্রতিনিধিরা অনেক কাজ করেন। লাইফ রিস্ক নিয়ে কাজ করেন। আমাদের টেমপার অনেক সময় লুজ হয়, আমাদের খুব মেজাজ খারাপ থাকে। খারাপ থাকলে বলবেন কালকে আসেন। আমরা অনেকে দুর্বব্যবহার করি। অনেকে ক্ষমতা পাওয়ার দেখাতে চাই। পাওয়ার হচ্ছে এরাউন্ড দ্যা সংয়ের মতো। আশা করি সকলে ভালো ব্যবহার করবেন । আমি চাই টিম নারায়ণগঞ্জ মানুষকে বুঝিয়ে বলবে। আমার টিম হবে আলোকিত টিম।’

মেয়েদের পিরিয়ডকালী সময়ে অসুবিধার কথা উল্লেখ্য করে ডিসি মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘অর্ধেকের বেশি মেয়েরা পিরিয়ডকালীন সময়ে কথা বলতে চান না, স্কুলে যান না। আমরা দেখেছি যে, তারা সাই ফিল করেন। কিন্তু এটি তো বায়োলজিক্যাল বিষয়, স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমার মায়েরও পিরিয়ড হয়েছে, বোনেরও হয়, সন্তানেরও হবে। কিন্তু পিরিয়ডকালীন সময়ে দেখেছি যে, একটা মেয়ে চারদিন-পাঁচদিন স্কুলে যান না মাসে। তাহলে, ১২ মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ দিনে সে স্কুলে যায় না। তাকে প্রোপার ফুড দেয়া হয় না। আমরা চাচ্ছি, প্রত্যেকটা স্কুলে একটা করে কর্নার করতে পারি কি না। যেখানে স্যানিটারী ন্যাপকিন, আয়রন পলিক এসিড, হ্যান্ড ওয়াশ, পেইন কিলার, একজন মহিলা টিচার ও ছাত্রী থাকবে। যারা স্কুল কালীন সময়ে মেয়েদের সাহায্য করবে, এজন্য আমরা কাজ করছি। ফুড এন্ড নিউট্রেশন আমরা ছেলেমেয়েদের দেই না। মাছের মাথাটা ছেলেমেয়েদের খাওয়াতে হবে। তা না হলে, আপনি ম্যাজিস্ট্রেট, ওসি, ডিসি বা চেয়ারম্যান হয়েছেন, কিন্তু আপনার সন্তানরা কিন্তু হতে পারবে না। আমার বাবা-মাকে স্যালুট তাদের কারণে আমি ডিসি হতে পেরেছি। কিন্তু আমি কনফিউস আমি কি সফল বাবা হতে পারবো? এই সমাজকে বাবা-মাকে আলোকিত করতে পারবে’।

এসময় বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান এম এ রশিদ, বন্দর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসমা সুলতানা নাসরিন, বন্দর থানা অফিসার ইনচার্জ দীপক চন্দ্র সাহা, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সালিমা হোসেন শান্তা, বন্দর প্রেসক্লাবের সভাপতি মোবারক হোসেন খান কমলসহ উপজেলাধীন ৪ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, বন্দরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষকসহ আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন বন্দর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু জাফর।

0
,