বন্ধুর হাতে খুন হওয়ার মজাই আলাদা (!) : তৈমূর আলম খন্দকার

0

“বন্ধুত্ব” মানব জীবনের একটি প্রত্যাহিক ঘটনা, যার জীবনে “বন্ধু” নাই, তার জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন। “পরিবার” সকলের জন্যই আপন, এটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আপন ভূবন। এ আপন ভূবনেরও ঘাটতি ঘটে যখন মানুষ বন্ধু হারা হয়ে পড়ে। নিজ পরিবারকে যা শেয়ার করতে মানুষ স্বাচ্ছন্ধ বোধ করে না, বন্ধুর সাথে তা করে অনায়াসে। বিপরীত লিঙ্গের সাথে যখন বন্ধুত্ব পরিনিত হয় আমৃত্যু “জীবন সাথী” হিসাবে, বৈধ সম্পর্ক পর্যন্ত গড়ায়, ব্যর্থতায় আত্মহত্যার অনেক ঘটনা রয়েছে, রয়েছে সামাজিক জীবনের পরিবর্তে ছন্নছাড়া জীবনের ইতিহাস। সম্রাট শাজাহান মমতাজের বন্ধুত্ব তথা প্রেমের কারণে তাজমহল গড়েছেন, পক্ষান্তরে গঙ্গার জলে শলিস সমাধির উদাহারন, পক্ষে বিপক্ষের ঘটনার পর ঘটনা দিয়ে বিশ্ব ইতিহাস আজ ভরপূর। বন্ধু বন্ধুর বিপদে ঝাপিয়ে পরা বা জীবন দেয়ার কাহিনীও রয়েছে অনেক, অনেক। ইংরেজীতে একটি প্রবাদ রয়েছে “অ ভৎরবহফ রং হববফ, যিবহ ধ ভৎরবহফ রং ফরফ” বাংলায় বলে “বিপদেই বন্ধুর পরিচয়”। অন্যদিকে বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন হওয়ার ঘটনা বিরল নহে, বরং সীমা ছাড়িয়ে। বিশ্বাস করে যে বন্ধুকে ঘরে এনেছে, সে বন্ধুই তার স্ত্রীর সাথে পরকীয়ায় জড়িয়েছে, ধরা পড়লেই মামলা, মোকদ্দমা নতুবা খুন, এমন ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র, একই ক্লাসে পড়ে, একই শিক্ষকের নির্দেশনায় জীবন গড়ার সাধনায় লিপ্ত, বিন্ধু মাত্র মত বিরোধ (তা হউক রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত) হলেই খুনের পরিকল্পনা, এমনকি নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা। খুন করার পর পুলিশের চাপে বা অনুশোচনায় অনেক খুনীই ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট স্বীকারোক্তি প্রদান করে জবানবন্ধী প্রদান করে যা ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্ধী রেকর্ড করেন; সে জবানবন্ধী পড়লে হতভম্ব হয়ে ভাবতে হয় এক বন্ধু অন্যবন্ধুকে কি ভাবে এতো নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতে পারে? একজন মানুষের পক্ষে তা কি ভাবে সম্ভব হয়? স্বামী স্ত্রী’কে হত্যা করছে, স্ত্রী স্বামী’কে হত্যা করছে। দীর্ঘদিন প্রেম করার পর একজন অন্যজনকে পুড়িয়ে হত্যা করার রয়েছে অনেক অনেক দৃষ্টান্ত। সম্প্রতি একজন পুলিশ সুপার (বাবুল) চট্টগ্রামে চাকুরীরত অবস্থায় তার স্ত্রীকে পরিকল্পনা করে হত্যা করার অভিযোগে চাকুরী ছাড়তে হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ উপর তলা থেকে নীচ তলা, নীচ তলা থেকে উপর তলা পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান। ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মানবজাতি ও সমাজ সরে এসেছে বিধায়ই বিশ্বস্থতার পরিবর্তে বেইমানীর ইতিহাস অনেক বেশী। ফলে মানুষে মানুষে অবিশ্বাস বৃদ্ধি পাওয়ায় খুনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

পুলিশ জনগণের বন্ধু। অথচ পুলিশের বিরুদ্ধেই চাদাবাজী, অর্থ আদায়ের ব্যর্থতায় মাদক ব্যবসায়ী অপবাদ দিয়ে খুন করার অভিযোগ। প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের যে ভাবেই হউক, আইনের আওতায় আনা দরকার, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আরো কঠোরভাবে দমন করা দরকার, তাই বলে ক্রস ফায়ার বা হত্যাই কি একমাত্র সমাধান? হত্যা করে যদি মাদক নির্মূল হতো, তবে একটা যুক্তি সরকার বা পুলিশ দেখাতে পারতো। গণমানুষ মাদক ব্যবসায়ী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের পতন চায়। কিন্তু যেহেতু পুলিশের একটি অংশ মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে মাদক ব্যবসা করছে সেহেতু সাধারণ মানুষ এখন পুলিশকে আর আস্থায় আনতে পারছে না। দেশের জনগণ আছে উভয় সংকটে। একদিকে তারা মাদক ও সন্ত্রাস মুক্ত সমাজ চায়, অন্যদিকে জনগণের বন্ধু পুলিশ তাদের নিজেদের কর্মদোষে জনগণের নিকট আস্থাহীন হয়ে পড়েছে। ফলে জনগণ পুলিশের উপর আস্থা রাখতে পারছে না। “পুলিশ জনগণের বন্ধু” একথা পুলিশ কর্তৃপক্ষ জোড় দিয়েই বলে। কিন্তু ট্রেজেডি হলো এই যে, জনগণ এ বন্ধুত্বকে আস্থায় আনতে পারলো না, যা গুণগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেলো, বাস্তবায়িত হলো না। এটা জনগণের জন্য যেমন একটি দু:সংবাদ, অন্যদিকে পুলিশ কর্তৃপক্ষের জন্য একটি পীড়া দায়ক বিষয়, যা হলো “আস্থাহীনতা”। পুলিশকে জনগণ কেন বন্ধু হিসাবে নিতে পারছে না, অদ্যবদি এ বিষয়টি গবেষণা করে দেখা হলো না। ভিন্ন ভিন্ন “প্রয়োজনের” স্বাদ মিটাতে যেয়ে জনগণের চাহিদা থমকে গেছে। (১) জনগণের “প্রয়োজন” জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা, (২) সরকারের “প্রয়োজন” ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য একটি লাঠিয়াল বাহিনী (যে বাহিনী খুন করলে বলা হবে এনকাউন্টার, আর মিথ্যা, ভ‚য়া কাল্পনিক মামলায়ও করা যাবে রিমান্ড বানিজ্য) এবং (৩) পুলিশের “প্রয়োজন” লোভনীয় পোষ্টিং এবং সিরিয়েল ডিঙ্গিয়ে প্রমোশন। এই তিন “প্রয়োজনের” চাহিদার মধ্যে সরকার ও পুলিশের “প্রয়োজন” একে অপরের সম্পূরক হওয়ায় জনগণের “প্রয়োজন” পিছনে পড়ে গেছে। ফলে “জনগণের” পরিবর্তে “সরকার” ও “পুলিশের” বন্ধুত্ব এখন জমজমাট। ফলে জনগণের অবস্থা ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত, দুইটি দুধ পান করে, একটি এমনিতেই লাফায় (!)

পার্শবর্তী রাষ্ট্র ভারত আমাদের বন্ধু। সরকারী দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী বলেছেন যে, “ভারতের সাথে আমাদের রক্তের সম্পর্ক”। বন্ধুত্বের গাড়তা ও দৃঢ়তা প্রমাণ করার জন্য ক্ষমতাবান মন্ত্রী মহোদয় হয়তো এ বক্তব্য রেখেছেন, নতুবা বন্ধুরা যাতে খুশী থাকে এ জন্যও বলতে পারেন। কিন্তু জনগণ এ বক্তব্যটি কতটুকু গ্রহণ করেছে তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবী রাখে। প্রতিনিয়তই বর্ডার এলাকায় বাঙ্গালীদের খুন করে বন্ধুরা তাদের হাত রঞ্জিত করছে। বর্ডার অতিক্রম করলে পৃথিবীর অন্য কোন রাষ্ট্রে গুলি করে হত্যা করা হয়? কোন ব্যক্তি অবৈধভাবে বর্ডার অতিক্রম করলে তাকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার চেয়ে প্রতিনিয়ত হত্যা করাই কি খাটি বন্ধুত্বের জন্য প্রয়োজন? রক্তের সম্পর্ক কি রক্ত ঝড়াই কি আরো মজবুত করতে হবে? সম্প্রতি ১৮/১৯ আগস্ট ২০২০ বন্ধু রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঢাকা সফরে এসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে একটি বৈঠক করেন, মিডিয়ার ভাষায় যা ছিল একটি “শীতল বৈঠক”। বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন “সীমান্ত হত্যাকান্ড নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছি।” পক্ষান্তরে বন্ধু রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন যে, “দু’দেশের সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় চলছে। ” অথচ এই সোনালী অধ্যায়ের মধ্যে বাংলাদেশের পানি সমস্যা, তিস্তা বাধ সমস্যা, দেশের বন্যা দীর্ঘ স্থায়ী হওয়ার সমস্যা নিয়ে কোন আলোচনা বা বন্ধুদের কোন প্রতিশ্রæতি নাই। ভারত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হয়েছে যার প্রতি বাংলাদেশের জোড় সমর্থন ছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বন্ধু ভারত বাংলাদেশকে সমর্থন করে নাই, বরং কৌশলগত ভাবে নিরব থেকেছে।

পাক-ভারত উপ-মহাদেশের রাজনৈতিক ও ভৌগলিক পেক্ষাপটের কারণে স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সহযোগীতা ছিল, তৎসময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী না হয়ে অন্যকেহ হলে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিষয়টি ভারত কি পদ্ধতিতে হ্যান্ডেল বা কোন বিবেচনায় নিতেন তাহাও পর্যালোচনার বিষয়। এক কোটি বাঙ্গালীকে ভারত আশ্রয় ও যুদ্ধে সামরিক সাহায্যের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বাংলাদেশ ভারতের সকল চাহিদাই পূরণ করেছে। এক সময় নেপালে ভ‚টানে ভারতীয় মুদ্রা চলতো, বাংলাদেশে ভারতীয় মুদ্রার চালানোর সুবিধা ছাড়া ভারত বাংলাদেশ থেকে সকল প্রকার সুবিধা নিয়েছে, বাংলাদেশকে তাদের পন্যোর বাজার বানিয়েছে। এখন এসেছে কোবিড-১৯ এর ভ্যাকসিন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে সরবরাহ করতে, যা এখনো আবিষ্কৃত হয় নাই অর্থাৎ “গাছে কাঠাল গোফে তেল।” মিডিয়া কিন্তু বিষয়টি অন্যচোখে দেখছে। তাদের মতে চীনের প্রভাবকে খাটো করে ভারতের প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য বন্ধু পররাষ্ট্র সচিবের হঠাৎ করেই বাংলাদেশে আগমন।

দুদকের বরাত দিয়ে মিডিয়া বলেছে যে, পার্শবর্তী রাষ্ট্রে ও.সি প্রদীপের অনেক সম্পত্তির খোজ দুদক পেয়ে মামলা রুজু করেছে। ২০১৮ সালে তদন্ত শুরু করলেও এতোদিন দুদক প্রদীপের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করে নাই। সারে তিন হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিং করে পি.কে হালদার হাই কোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা স্বত্বেও বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুধাংশু ভদ্র করোনা পজিটিভ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছবি তোলে, এতো শক্তি পি.কে হালদার ও সুধাংশুরা পায় কোথায়? প্রিয়া সাহা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা হীনতার বিষয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নিকট মিথ্যা অভিযোগ করে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধ করেছে, তারপরও দেশের প্রচলিত আইন তাদের স্পর্ষ করতে পারে নাই। অথচ বন্ধু রাষ্ট্রে মুসলমানরা কোন অবস্থায় রয়েছে? এন.আর.সি’র নামে ভারতে সংখ্যালধু মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খুন করা হচ্ছে। নোভেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ আমত্য সেন জার্মানির সংবাদ মাধ্যমকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, “মোদি সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন হচ্ছে। এ ছাড়া এখন সরকারের সমালোচনা করলে হয়রানি ও জেলে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশী।” ভারতের মুসলমানরা আজ মোদী সরকারের হয়রানী ও হত্যার শিকার। সীমান্তে (বর্ডার) বাংলাদেশী হত্যার বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব সীমান্ত হত্যাকান্ডের বিষয়ে উদ্দ্যেগ জানিয়েছেন, জোর প্রতিবাদ করতে পারেন নাই, বলতে পারেন নাই কেন সীমান্ত অতিক্রম করলে হত্যা করা হবে? প্রতিবারই শুনি সীমান্ত হত্যা কমিয়ে আনা হবে। কিন্তু হত্যা বন্ধ করার দাবী বাংলাদেশ করতে পারে না কেন? সীমান্ত হত্যা কি কমেছে? নাকি বৃদ্ধি পেয়েছে? একটি প্রবাদ রয়েছে যে, “মুলা চুরি করলে ফাসি হয় না।” কিন্তু ভারত-বাংলা সীমান্তে বিনা বিচারে অকাতরে হত্যা হয়, যার জন্য বাংলাদেশ শুধু উদ্দ্যোগই জানায়, জোর প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করতে পারে কি? অপরাধ করলে নিজ দেশের আইনে বিচার করার দাবী তুলতে পারে নাই। অন্যদিকে বাংলাদেশও রয়েছে নানা বিধ শোষনের মূখে। তবুও ভারত আমাদের রক্তের সম্পর্কিত বন্ধু। ফলে বলতেই হবে যে, বন্ধুর হাতে খুন হওয়ার মজাই আলাদা (!)।

লেখক

রাজনীতিক, কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)

0