বিপাকে নুর হোসেনের স্ত্রী রোমা, বাদ নেই বান্ধবী নীলাও

0

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ৭ খুনের আসামি ফাসির দন্ড নিয়ে কাশিমপুর জেলা খাটছেন। হাইকোর্টের রায়ের পর মামলাটি এখন শুধুই আপীলের রায়ের অপেক্ষায়। এদিকে স্বামী নুর হোসের অপরাধের ছোঁয়া থেকে বাদ যায়নি তার স্ত্রী রোমা হোসেন ও বান্ধবী জান্নাতুল ফেরদৌস নীলা। দুইজনই নুর হোসেনের অপরাধের খেসারত দিচ্ছেন। নুর হোসেনের স্ত্রী রোমা হোসেনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় চার্জশিট অনুমোদন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঙ্গলবার (২১ মে) এ চার্জশীটের অনুমোদন দেওয়া হয়।

দুদক উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানান, চার্জশিটে রোমার বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৪৩ লাখ ২২ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০১৬ সালের ১ আগস্ট রাজধানীর রমনার থানায় এ ব্যাপারে মামলা করেন দুদক উপ-পরিচালক মো. জুলফিকার আলী। মামলা তদন্তকর্মকর্তা হলেন দুদক সহকারী পরিচালক মো. শফিউল্লাহ।

এর আগে, নূর হোসেনের বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ২ মে কমিশন এ অভিযোগপত্র অনুমোদন দেয়। ২০১৬ সালের ১ আগস্ট রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি করেন দুদকের উপপরিচালক (বর্তমানে পরিচালক) মো. জুলফিকার আলী। তিনি ও সহকারী পরিচালক শফিউল্লাহ মামলার তদন্ত করেন। ওই মামলায় একইদিন নূর হোসেনের স্ত্রী রুমা আক্তারকে (৪০) গ্রেফতার করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি টিম।

দুদকের তদন্তে দেখা গেছে, নূর হোসেনের ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৪৭ হাজার ৮৬৯ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। কিন্তু মাত্র ১ কোটি ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬ টাকার উৎস পাওয়া যায়। অর্থাৎ তিনি ২ কোটি ৮১ লাখ ১১ হাজার ৮১৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। এ ছাড়া ২ কোটি ৪৫ লাখ ৪ হাজার ১৭২ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। নূর হোসেনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে ২০১৪ সালের ১৯ মে অনুসন্ধান শুরু করার পর নূর হোসেনের নামে-বেনামে প্রায় ৮ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজ পায় দুদক।

২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর তার যাবতীয় সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ দেয় সংস্থাটি। পরে ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার-২ এর জেল সুপারের মাধ্যমে সম্পদ বিবরণী দাখিল করে নূর হোসেন। তবে তার দাখিলকৃত ওই সম্পদ বিবরণীতে মাত্র ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব দেখানো হয়।

এরপর, ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী দুদকের উপ-পরিচালক মো. জুলফিকার আলী ও সহকারী পরিচালক শফিউল্লাহ এর নেতৃত্বে একটি টিম নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে নূর হোসেন, তার স্ত্রী ও পরিবারের লোকজনদের সম্পদের খোঁজ খবর নেন। তারা সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড়ে নূর হোসেনের মালিকানাধীন বাড়ি, নূর হোসেনের মালিকানাধীন হাজী বদরউদ্দিন মার্কেট, শিমরাইল টেকপাড়ার নূর হোসেনের বাড়ি, নয়াআটির রসুলবাগের নূর হোসেনের স্ত্রীর নামে করা বাড়ি, মুক্তিনগর কিসমত মার্কেট এলাকায় তার বড় ভাই নূর ছালামের বাড়ি, রসুলবাগ এলাকায় তার ছোট ভাই বিএনপি নেতা মিয়া মোহাম্মদ নূর উদ্দিনের বাড়ি ও নূর হোসেনের মালিকাধীন পরিত্যক্তভাবে পড়ে থাকা এবিএস পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন সম্পত্তি পরিদর্শন করেন। তবে ওই সময় নূর হোসেনের ছোট ভাই বালু সন্ত্রাসী নুরুজ্জামান জজের নামে করা ৬ তলা বাড়িতে দুদকের টিমকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। দুদকের টিম দেখে বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী মূল ফটকে তালা বদ্ধ করে দেয়। এরপর ২০১৬ সালের ৯ মার্চ নূর হোসেনের স্ত্রী রুমা হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। পরে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৬ সালের ১ আগস্ট রাজধানীর রমনা থানায় নূর হোসেন ও তার স্ত্রী রুমা আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ওই মামলার প্রেক্ষিতেই রুমা আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়। দুদক ওই বছরের ২৯ মে তাঁর সম্পদের অনুসন্ধানে নামলেও পরে এই কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ভারত থেকে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর দুদকের অনুসন্ধানেও গতি আসে। তারই ধারাবাহিকতায় উপপরিচালক জুলফিকার আলী অনুসন্ধান শেষে মামলা করেন নূর হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে।

এদিকে, শান্তিতে নেই নুরের বান্ধবী নীলা। নুরের অপরাধের খেসারত দিচ্ছেন তিনিও। সামাজিক সম্মানহানীর পাশাপাশি তাকে অনেক আইনী পথ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সম্প্রতি একটি হত্যা মামলা নীলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি । সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদের পর ফের আলোচনায় উঠে আসে নীলা।

সিদ্ধিরগঞ্জের মাদক ব্যবসায়ী খায়রুল ইসলাম জুয়েল হত্যা মামলার অধিকতর তদন্তের অংশ হিসেবে মামলার তদন্ত অফিসার জেলা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মো. ছরোয়ার জাহান সরকার নুরের বান্ধবী নীলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ মামলায় নীলা জামিনে রয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক হাবিবুর রহমান বলেন, ২০১৩ সালের ২৬শে অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন আজিবপুর গ্রাম থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ে মস্তকবিহীন একটি মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করার পর জানতে পারে মরদেহটি নোয়াখালী জেলার মাসুমপুর গ্রামের ফিরোজ খানের ছেলে খায়রুল ইসলাম জুয়েলের (৩০)।

আদালত সূত্রমতে, জুয়েল হত্যা মামলায় ঘাতক লঞ্চ সোহেল, কালা সোহাগ ও মনা ডাকাত নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তারা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেখানে তারা বলেছিলেন, মাদক ব্যবসার দেনা-পাওনা নিয়ে নীলার সঙ্গে জুয়েলের বিরোধ দেখা দেয়। এতে নীলার নির্দেশে খায়রুল ইসলাম জুয়েলকে গলা কেটে হত্যার পর দেহ এক স্থানে ও মাথা আরেক স্থানে ফেলে দেন তারা। আসামিদের স্বীকারোক্তির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ নীলাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়।

পুলিশ এই হত্যা মামলায় নীলাসহ ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয়। কিন্তু পুনরায় মামলাটি সিআইডি তদন্ত করতে গিয়ে নীলাসহ ১৭ জনকে অব্যাহতির আবেদন করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন জেলা সিআইডির পরিদর্শক মো. নূরুন নবী। যদিও অব্যাহতি চাওয়া ১৭ জন আসামির মধ্যে ১৩ জনের নাম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রয়েছে।

সাত খুনের ঘটনার পর জান্নাতুল ফেরদৌস নীলা ব্যাপকভাবে আলোচনায় উঠে আসেন। কারণ তিনি ৭ খুন মামলার অন্যতম আসামি নুর হোসেনের বান্ধবী। ২০১১ সালের ৩০ শে অক্টোবর এনসিসির নির্বাচনে সংরক্ষিত ওয়ার্ডে (৪, ৫ ও ৬) নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হন জান্নাতুল ফেরদৌস নীলা। একই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা নুর হোসেন ৪নং ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এর অল্প দিনের মাথায় নুর হোসেনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে নীলার।

0