মানুষ এতো নির্দয় হয় কিভাবে!

0

আমরা কিছুই লিখলাম না। একজন পেশাদার ডাক্তার ও সাংবাদিকের সঙ্গে পুলিশের এ আচরনের তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও তার দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবী করে সাংবাদিক বিল্লাল হোসেন রবিনের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি তুলে ধরলাম।

মানুষ এতো নির্দয় হয় কিভাবে!!!

১৩ এপ্রিল রাত ১০টা ১০ মিনিটে এক ছোট ভাইয়ের ফোন পাই। ভাই শুনছেন কিছু, আমি বললাম না তো। সে বললো সাংবাদিক সাইফুদ্দিন সবুজ ভাই স্ট্রোক করে মারা গেছে। কি বলো!!! দ্রুত ফোন কেটে সবুজ ভাইয়ের নাম্বারের ফোন দিলাম। ওই প্রান্তে সবুজ ভাইয়ের ছোট ছেলে অমিও ফোন রিসিভ করে বলে চাচ্চু এই নাম্বার থেকে তোমাকে আর কোন দিন কেউ ফোন দিবে না। ওর কথা শেষ না হতেই হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকি। কান্নার মধ্যেই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সবাইকে জানাই সবুজ ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ। স্ট্যাটাস দেয়ার পর সত্যতা জানতে অসংখ্যক ফোন আসে আমার কাছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার সকালে ঢাকা থেকে সবুজ ভাইয়ের মরদেহ কুমিল্লার দাউদকান্দির কালাসাদারপর ভুইয়াবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে জানাযা শেষে দাফন করা হবে। কিভাবে সেখানে যাওয়া যায় প্লান করতে থাকি। রাতে আমার ভাতিজাকে বিষয়টি জানালে সে হাইয়েস একটি গাড়ি ভাড়া করে দেয়। কিছুটা স্বস্থি পাই। কিন্তু তারপরও রাতভর ঘুম হয়নি। কখন সকাল হবে। সকাল ৭.২২ মিনিটে পাই। বলা হয় ভাই আপনাকে বলতে ভুলে গেছি। আমরাতো রওয়ানা হয়ে গেছি। আপনি দ্রুত রওয়ানা দেন। স্ত্রীকে সাথে নিয়ে রওয়ানা হলাম। আদমজী র‌্যাব-১১ এর কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু করে দাউদকান্দি ব্রিজের পশ্চিম পাড় পর্যন্ত বেশ কয়েক জায়গায় আমাদের গাড়ি আটকালো আইনশৃংখলা বাহিনী। নিজের পরিচয় দিয়ে বিষয়টি জানানোর পর ছেড়ে দিল সবাই। কিন্তু দাউদকান্দি ব্রিজ থেকে পুর্ব পাড়ে নামার পর ব্রিজের গোড়ায় বড় ধরণের একটা ঝটলা চোখে পড়লো। ১০ থেকে ১২জন যুবক। সবার হাতে লাঠি। কোন গাড়িকে তারা যেতে দিচ্ছে না। আমাদের গাড়িও আটকে দিল। এবং গাড়ি ঘুরিয়ে ঢাকামুখী পার্কিং করার নির্দেশ দিলো। তাই করা হলো। সেখানে একজন পুলিশ অফিসারকে দেখে গাড়ি থেকে নামলাম। সম্ভবত তিনি দাউদকান্দির থানার এসআই। নাম শাহাদাত। কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম একজন ভদ্র মহিলা পিপিই পড়া। পরে জানলাম তিনি একজন ডাক্তার। কুমিল্লা ভিক্টরিয়া হাসপাতালে যাবেন। জরুরী ভিত্তিতে। কিন্তু তার গাড়িও আটকে দেয়া হয়েছে। তিনি বার বার বলার পর তার যাওয়ার প্রয়োজনটা কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে না সেখানে। এক পর্যায়ে তার সাথে খারাপ ব্যবহারও করে লাঠি হাতে যুবকরা। পরে ডাক্তার মুখের মাক্স সরিয়ে উচ্চস্বরে বলতে থাকেন। ডাক্তারদের বাধা দেয়ার পারমিশন বা অনুমতি কোথায় পেলেন। আমি তো ডাক্তার, রোগীর সেবা দিতে যাচ্ছি। তার কোন কথাই যেন আমলে নিচ্ছেন না ওই পুলিশ কর্মকর্তা। পরে ডাক্তারের সাথে থাকা সম্ভবত তার হাসব্যান্ড ঘটনাটি ভিডিও করতেছিলেন। এবং বিষয়টি তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয়ে নজরে আনবেন বলে জানান। এই কথা শোনার পর উপস্থিত সবাই বলে উঠেন করেন করেন ভিডিও করেন, দেখি কি করতে পারেন। এদিকে আমি একাধিকবার এসআইকে আমার পরিচয় দিয়ে বিষয়টি বলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। তার ভাব এমন, তিনবার বললে উনি একবার উত্তর দেন। এক পর্যায়ে ব্যাপক হৈ চৈয়ের পর ডাক্তার ভদ্র মহিলাকে অনেকটা অপমানের সাথে যাওয়ার পারমিশন দেয়া হয়। আর আমি এসআইকে অনেক অনুরোধ করলাম ভাই চলে আসছি তো। এ পর্যন্ত আসতে কয়েকটা জায়গায় আটকিয়েছিল পরিচয় এবং বিষয়টি বলার পর ছেড়ে দিয়েছে। তারা যদি না আসতে দিতো তাহলে এই পর্যন্ত আসতে পারতাম না। এসেই যেহেতু পড়েছি আর হয়তো ১৫-২০ মিনিট লাগবে আমার পৌছাতে একটু যেতে দেন। তিনি বলেন জানাযা পড়ে কি করবেন। নিজের চিন্তা করেন। এই কথা শোনার পরও নিজেকে একেবারে সংযত রাখলাম। আমি বললাম জানাযা না পেলেও অনন্তত কবরে একটু মাটি তো দিতে পারবো। অনেক কস্ট করে আসছি শেষবারের মতো ভাইটার চেহারাটা দেখবো বলে। এও বললাম, মরদেহের সাথে আরো কয়েকটা গাড়ি গিয়েছে এখান দিয়ে। আপনি নিশ্চয় ছিলেন, আমি একটু পেছনে পড়ে গিয়েছি। তিনি বলে কিন্তু আর কোন গাড়ি যেতে দিবো না। ২০ থেকে ২৫ মিনিট তাকে বিভিন্নভাবে রিকোয়েস্ট করেছি। কিন্তু পাষান পুলিশ কর্মকর্তার হৃদয় গলাতে পারিনি। ক্ষমা চাই, সবুজ ভাই ইচ্ছা থাকা সত্বেও আপনার জানাযা পড়তে পারলাম না, না পারলাম শেষবারের মতো মুখটা একবার দেখতে। আর কবরে এক মুঠো মাটিও দিতে পারলাম না। সবুজভাই আপনার সাথে আমার কি সম্পর্ক ছিল যা কাউকে বুঝাতে পারবো না। কখনো ছোট ভাইয়ের আদর স্নেহ কখনো বন্ধুর মতো আচরণ। ৩০ বছরের সম্পর্কে কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। নিরবে চোখের জল ফেলতে ফেরতে অবশেষে বাসায় ফিরলাম।

কিন্তু প্রশ্ন হলো ১৪ সিটের একটি হাইয়েস গাড়িতে আমরা তো মাত্র ৩জন লোকই ছিলাম। আর পুলিশ কর্মকর্তা ১০-১২জন নিয়ে গাড়ি আটক করছে। তিনি কি সামাজিক দুরুত্ব বজায় রেখেছেন? আর পুলিশ তার সঙ্গী ফোর্স নিয়ে যেখানে দায়িত্ব পালন করছে সেখানে লাঠি হাতে এই যুবকরা কেনো? শুধু তাই নয়, পুলিশ কর্মকর্তার নিজেরও মুখে মাস্ক নেই, নেই হাতে হ্যান্ড গ্ল্যাভস। অথচ আমার মুখে মাস্ক এবং হাতে হ্যান্ড গ্ল্যাভস ছিল। যতটা নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায়, তাই করেছি।

আর এমন তো না সড়কে কোন গাড়ি চলছে না। চলছে তো। তবে সংখ্যাটা চোখে লাগার মতো না। একান্ত জরুরী প্রয়োজনে যারা বের হচ্ছেন।

এদিকে সাংবাদিক রবিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি পারতাম উর্ধতন কোন অফিসারকে ফোন করতে তিনি হয়তো আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিতেন।,কিন্তু করিনি, কারণ ডাক্তার, সাংবাদিকের সাথে একজন সামান্য সাব ইন্সপেক্টরের আচরণটা যদি এমন হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থাটা কেমন। এটা জানুক সবাই। ভালো পুলিশের মধ্যে লুকিয়ে আছে খারাপ কিছু পুলিশ।

0