মামলায় ক্ষতবিক্ষত অনেকেই, প্রধাণমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান ভুক্তভোগীরা

‘আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা সাপকে খুব ভয় পান। সাপ দেখলেই গা শিরশির করে উঠে। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, সাপ পৃথিবীর অন্যতম বিষাক্ত এবং ভয়ংকর প্রানীর একটি। সাপের বিষাক্ত ছোবল যেমন মানুষের ভয়ের কারণ তেমনি কিছু কিছু রাজনীতিকও অন্যায়ের প্রতিবাদকারীদের কাছে ভয়ের কারণ। কেননা প্রতিপক্ষ প্রতিবাদীদের শায়েস্তা করতে এরা বিভিন্ন পন্থায় আক্রমণ (ছোবল) করেন। প্রতিবাদী ও প্রতিপক্ষদের দমনে এরা মামলা-হামলাকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। এমনই একজন রাজনীতিক নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বিদায়ী মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ডাঃ সেলিনা হায়াত আইভী। নামের আগে ডাক্তার শব্দটি থাকায় অনেকেই তাকে মানবিক মনে করলেও বাস্তচিত্র সম্পুর্ণ ভিন্ন। মেয়র আইভীর স্বেচ্ছাচারীতা, অনিয়ম, দূর্ণীতি, মিথ্যাবাদীতা, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বললেই তিনি হয়ে ওঠেন হিংস্র। কখনো করেন অকথ্য ভাষা ব্যবহার, কখনো চালান হামলা-মামলা। বিগত কয়েক বছরে মেয়র আইভী ও তার লোক-স্বজন দিয়ে প্রতিপক্ষকে দমাতে একের এক মামলা করেছেন। তাদের মামলার আসামী হয়েছেন অনেক সাংবাদিক, হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দসহ খোদ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও। মেয়র আইভীর বিষাক্ত ছোবলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এখন কারাবন্দি আনন্দ টিভি ও দৈনিক সংবাদচর্চার সাংবাদিক সৈয়দ সিফাত আল রহমান লিংকন’। তার পিতা বীরমুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ লুৎফর রহমান নগরীর ১৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও প্রবীন সাংবাদিক। লিংকন গ্রেফতার হওয়ার পর শনিবার আদালতপাড়ায় এমন অভিযোগ করে ফুসে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ।
তারা জানিয়েছে, দেশদ্রোহী ষড়যন্ত্রকারীদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সরকারের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে সাংবাদিক ও প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন মেয়র আইভী ও তার লোকজনরা। নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিকদের নামে একের পর এক মামলা দিয়ে কন্ঠরোধ করতে চাইছেন তারা। মেয়র আইভীর আপন ছোটভাই আলী রেজা রিপনের দায়েরকৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় আনন্দ টিভির জেলা প্রতিনিধি সৈয়দ সিফাত আল রহমান লিংকন (৩০) কে গ্রেফতার করেছে ফতুল্লা থানা পুলিশ। শনিবার (২০ নভেম্বর) মধ্যরাত ২টার দিকে নিজ বাসা থেকে লিংকনকে গ্রেফতার করে। সকালে পুলিশ তাকে আদালতে প্রেরণ করেন। আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে। গ্রেফতারের পূর্বে সৈয়দ সিফাত আল রহমান লিংকন শনিবার রাত ২ টা ৫ মিনিটে তার নিজস্ব ফেইসবুক পোস্টে লিখেন, ‘এই মুহুর্তে আমাকে পুলিশ এসে নিয়ে যাচ্ছে, মেয়র আইভীর ভাইয়ের করা আইসিটি মামলার জন্য, দয়া করে আমার সহকর্মী, সকলের সহযোগীতা চাই’।
জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৫ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় দায়েরকৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সাংবাদিক লিংকনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের জের ধরে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর ছোটভাই জেলা যুবলীগের সহ সভাপতি আলী রেজা রিপন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। লিংকন ছাড়াও একই দিনে পৃথক মামলায় নারায়ণগঞ্জের বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে আসামী করা হয়।
শুধু সাংবাদিক নয়, যারাই তার অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তাদেরই মামলা দিয়ে দমন করার চেষ্টা করেছেন মেয়র আইভী। এমন অভিযোগ করে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েকজন নতো জানান, কয়েক বছর পূর্বে শহরে হকার উচ্ছেদ নিয়ে লংকাকান্ড ঘটান আইভী। বিএনপির ক্যাডার, নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী ও সিটি কর্পোরেশনের লোকজনসহ চাটুকার বাহিনী নিয়ে রাস্তায় নেমে হকারদের পেটাতে থাকেন আইভী নিজে। এসময় হকাররা প্রতিবাদ করলে বেধে যায় সংঘর্ষ। ঐ সংঘর্ষে ২/৩ হাজার হকার যখন এগিয়ে আসছিলো তখন আইভী ও তার ক্যাডার বাহিনীকে পিষে মারার উপক্রম হলে কেন্দ্রের নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দরা সমর্থকদের নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। এনিয়ে থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ হলেও পুলিশ কোন পক্ষের মামলাই গ্রহণ করেনি। ঐ ঘটনায় দু বছর পর মেয়র আইভী সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাকে দিয়ে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের নামে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এনে মামলা দায়ের করেন।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শত কোটি টাকার সম্পত্তি জিউস পুকুর আইভী পরিবার কতৃক দখলের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা এতে একাত্মতা ঘোষনা করেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় মেয়র আইভী নিজে বাদী হয়ে খোকন সাহা ও অপর একজনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেন।
সাংবাদিক ও রাজনীতিবীদরা জানান, ‘একের পর এক মামলা-হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষ দমনের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন মেয়র আইভী। আমরা আইভীর হয়রানীমূলক মামলা থেকে রক্ষায় মাননীয় প্রধাণমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন সংশ্লিষ্ঠরা’।