মেয়র আইভীর ‘সাফল্য’ মুখে মুখে, বাস্তবতা ভিন্ন

0

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ: শিশুর জন্মের পর জন্ম নিবন্ধন থেকে মৃত্যুর পর মৃত্যু সনদ প্রদান পর্যন্ত দায়িত্ব রয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের। মাঝে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা, জীবনমানের উন্নয়নসহ নানা সেবা তো রয়েছেই। এ কাজ গুলোতে সংস্থাটির মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ‘উল্লেখযোগ্য’ সাফল্য খুঁজে পেয়ে আবারও ভোট দিয়ে জয় যুক্ত করার প্রস্তাব রাখছে অনেকেই। অথচ তাঁর কাজ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে। খোদ সিটি কর্পোরেশনও ৩৯টি সমস্যা চিহিৃত করেছে এই নগরীর।

মুখেমুখে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরাট ‘সাফল্যের’ সঙ্গে বাস্তবের ব্যবধান অনেক। দেশের সর্বোচ্চ (শতকরা ২২ শতাংশ) ট্যাক্স দিয়ে পুরোপুরি সুবিধা পাচ্ছে; এমন মানুষ নারায়ণগঞ্জ সিটিতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই সিটির বহু জায়গায় সিটি কর্পোরেশনের কোন সেবাই নেই। আর পয়োনিষ্কাশন এখনো মহাপরিকল্পনানির্ভর, ভারী বৃষ্টি হলে নারায়ণগঞ্জের বড় অংশ ডুববে, এটি এখন মানুষ একরকম মেনেই নিয়েছেন।

এরপরও সেলিনা হায়াৎ আইভীকে পুনরায় মেয়র পদে নির্বাচিত করতে উন্নয়ন ও সাফল্যের গল্প প্রচার করছেন একটি পক্ষ।

অথচ, ‘ক্যাপিটেল ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (সিআইপি) ২০১৫-২০২০’ নামক সিটি কর্পোরেশনের একটি পরিকল্পনায় নগরীর ৩৯টি সমস্যা চিহিৃত করা হয়েছে। এ সকল সমস্যা গুলোকে ৩ স্তরে (১. সর্বোচ্চ প্রভাব, ২.মাঝারি প্রভাব, ৩. তুলনামূলক কম প্রভাব) ভাগ করেছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের পরিকল্পনা বিভাগ।

সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলা সমস্যা-
১/ নারী বান্ধব পাবলিক টয়লেট, পাবলিক গ্রন্থাগার, কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দিরের উন্নতি বা নাগরিক সেবার উন্নতি করা প্রয়োজন, ২/বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ৩/জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ সিস্টেম ব্যবস্থাপনা এবং খাল পুনরায় খনন, ৪/রাস্তা প্রশস্ত করা প্রয়োজন, ৫/ পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন
(মাথার ট্যাঙ্কের উপর, গভীর নলকূপ) প্রয়োজন, ৬/ জনসচেতনতা বৃদ্ধির অভাবের কার্যক্রম, ৭/নদী দূষণ, ৮/বিশুদ্ধ খাবার পানি, ৯/ দরিদ্র এবং দুর্বল মানুষের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্রের অভাব, ১০/ প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠের অভাব, ১১/নদীর নাব্যতা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, ১২/ পরিকল্পিত নগরায়ন প্রয়োজন, ১৩/পাবলিক প্লেস প্রয়োজন, ১৪/বাজার এবং কসাইখানার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রয়োজন, ১৫/ওয়ার্ড-ভিত্তিক কমিউনিটি সেন্টারের অভাব, ১৬/ বিনোদন কেন্দ্র, পাবলিক প্লেস উন্নয়ন, ফুট ওভার ব্রিজ নির্মাণ ও পুকুর সংরক্ষণ প্রয়োজন।

মাঝারি প্রভাব ফেলা সমস্যা গুলো হলো
১/মানব সম্পদ উন্নয়ন, ২/ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ৩/ কারিগরি প্রতিষ্ঠান, জনসাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, ৪/ বাস ও ট্রাক টার্মিনাল, বাজার, সম্প্রদায় কেন্দ্র, রাস্তার আলো, স্বাগতম গেটসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ৫/খেলার মাঠ উন্নয়ন, ৬/ ডে-কেয়ার সেন্টার নির্মাণ, ৯/যোগ্য চিকিৎসা কেন্দ্র, ১০/নবায়নযোগ্য শক্তির উন্নয়ন (সৌর শক্তি, জৈব-গ্যাস) প্রয়োজন, ১১/পৌর বাগানের অভাব, ১২/পৌর মেডিকেল সেন্টারের অভাব, ১৩/ কবরস্থান, শ্মশান এবং ঈদগাহ উন্নয়ন প্রয়োজন।

তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলা সমস্যা গুলো
১/ নবায়নযোগ্য উন্নয়ন শক্তি সম্পদ (সৌর শক্তি, জৈব গ্যাস), ২/স্বল্প আয়ের মানুষ সুবিধায় ক্ষুদ্র শিল্পমুখী আর্থিক সাহায্য, পুনর্বাসন এবং আবাসন সেবা, ৩/নগরায়নের চাপে নিকটতম ভবিষ্যত নিয়ে পরিকল্পিত অবকাঠামো বিশালতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য উন্নয়ন প্রয়োজন, ৪/ ম্যুরাল-স্মৃতিস্তম্ভের অভাবশহরের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ভাস্কর্য-গোল চত্বর প্রয়োজন, ৫/অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক পরিষেবা লাইন, ৬/ ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসের অভাব, ৭/ সবখানে ওয়াইফাই সার্ভিসের অভাব পৌর এলাকা। ৮/পৌর বাজারের অভাব, ৯/ বাস ও ট্রাক টার্মিনাল সম্প্রসারণ প্রয়োজন, ১০/ রাস্তার আলোর উন্নয়নে এলইডি এবং সোলারের সুবিধা শক্তি আরও প্রয়োজন।

জানা গেছে, ৭২.৩৪ বর্গ কিলোমিটার জমি নিয়ে ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন গঠন হয়। এরপর দু’ দফা নির্বাচনে মেয়র হয়েছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। সিটি কর্পোরেশন গঠনের পূর্বেও নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় আরও ৮ বছর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। সবকিছু মিলিয়ে ১৮ বছর এই নগরীর উন্নয়নে দায়িত্ব পালন করছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। এই নগরীর উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, অনেকে প্রশ্ন রাখছেন, তারপরেও কেন এত সমস্যা এই নগরীতে? অনেকেই বলছেন, এই নগরীর উন্নয়নে আর কত সময় প্রয়োজন সেলিনা হায়াৎ আইভীর?

এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক তৈমূর আলম খন্দকরা বলেন, ‘এই নগরী যে সিটি করপোরেশন হওয়ার যোগ্য, সে ব্যাপারটি নিয়ে সরকারের কাছে তথ্য ও উপাত্ত তুলে ধরে আবেদন করে ছিলাম আমি। তারই প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা হয়। তখন এই সিটি করপোরেশন নিয়ে অনেক আশা, ভরসা ছিল। এখন সেই আশা ভরসা আর নেই। সিটি করপোরেশন হলেও এই মেয়রের অধিনে তেমন কোন উন্নয়নই হয়নি।’

0