রহস্যময় মেয়র: আর কত প্রাণ হারালে দায়ি হবে ঠিকাদাররা

0

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (এনসিসি) উন্নয়ন কাজে একের পর এক প্রাণ হারালেও সুষ্ঠ বিচার যেমন হচ্ছে না। তেমনি প্রাণ যেন আর হারাতে হয়, তার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নেয়া হয় না। এমনটাই অভিযোগ উঠেছে এনসিসির টিকাদার, মেয়রসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। সচেতন নাগরিকদের দাবি, ‘অবহেলা ও গাফলতির জন্যই মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, এর দায় মেয়র এড়াতে পারবে না’।

গত ১৩ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পয়োনিষ্কাশনের নালা (ড্রেন) তৈরির সময় দেয়াল চাপায় প্রাণ হারাণ নির্মাণ শ্রমিক দুলালীসহ দুই জন।
‘অবহেলা ও গাফলতি’র অভিযোগ এনে দায়ের করা মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি বন্দর থানা পুলিশ। তবে, বন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দিপক চন্দ্র সাহা বলেন, ‘আসামিরা জামিনে রয়েছে। আর মামলা রয়েছে তদন্তাধীন।’

পুলিশ আসামীদের আইনের আওতায় আনতে না পারলেও দুলালীর স্বামী ও মামলার বাদী আফতাব হোসেন জানান, ‘আমি মুর্খ মানুষ, আমি তো কিছু জানি না। মানুষ আমাকে যা বলে, তাই শুনি। মানুষ বলাবলি করে- কাজটা সরকারি, দেয়ালটিও সরকারি। মামলা করে কী বিচার পাবি? তাই আসামীরা ডেকে নিয়ে ২ লাশের জন্য দেড় লাখ করে টাকা দিয়ে আপোষ মিমাংসা করিয়ে নিয়েছে। যদি মামলা করতাম, এই যে, দেড় লাখ পেয়েছি, এটাও তখন পেতাম না। আমি দোষ এখন কাউকে দিতে পারি না, দোষ এখন আমার কপালের।’

তবে, বন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) দিপক চন্দ্র সাহা মিমাংসার বিষয়টি জানেনা বলে জানিয়েছেন। অভিযুক্ত আসামিরা হলেন- নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ঠিকাদার বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা শুক্কুর প্রধান, নবীগঞ্জ রসূলবাগের মৃত মোবারজ হোসেনের ছেলে শাখাওয়াত হোসেন ও বাগবাড়ি এলাকার চুন্নুর ছেলে আকিল।

আর কত প্রাণ হারালে আইন মানবে সিটি করপোরেশন এর ঠিকাদাররা?
২০১৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় দেওভোগ এলাকায় পয়োনিষ্কাশনের নালা (ড্রেন) নির্মাণের সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাড়ীর পশ্চিম পাশের দেয়াল ধ্বসে মুত্যু হয় মনির হোসেন (২০) নামের এক শ্রমিকের। ওই ঘটনায় মারাত্মক আহত হন মজিবুর রহমান (৪৪) ও নাসির (২৪) নাসের আরও দুই শ্রমিক।

কোন রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া কাজ করতে গিয়ে ২০১৫ সালে বন্দরের ২৩নং ওয়ার্ডের একরামপুর ইস্পাহানী এলাকায় আরসিসি ড্রেনের রড ঢুকে যায় রিকশা চালক নুরুল ইসলামে শিশু কণ্যা পপি (৬) এর শরীরে।

গত ১৩ জুলাই ২৫ নং ওয়ার্ডের বন্দরের উত্তর লক্ষণখোলা এলাকায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বন্দরে পয়োনিষ্কাশনের নালা (ড্রেন) নির্মাণের সময় দেয়াল ধ্বসে এক নারীসহ দুই নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও একজন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৯ নং ওয়ার্ডের জালকুড়ী যুব উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও সেই সিটি করপোরেশন এলাকার পয়োনিষ্কাশনের নালা (ড্রেন) নির্মাণ কাজ হচ্ছে। কর্মস্থলের নিরাপদ পরিবেশ ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাচ্ছে সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দেখার কেউ নেই।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কাজে নিয়জিত একাধীক নির্মাণ শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ এতোসব নিরাপত্তার কতা কইলো তো আমাগো কাজেই রাখবো না’।

দায় এড়াতে পারবে কী সিটি করপোরেশন?
স্থানীয় সরকারের এই সংস্থার যে রাস্তা-ড্রেন উন্নয়নের কথা বলে, এই খাতের প্রধান উপাদান শ্রমিকেরা সবাই অস্থায়ী। মূলত ঠিকাদারদের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে থাকে, আর শ্রমিকদের আয় থেকে একটি অংশ নিয়মিতভাবে নিয়ে নেন ওই ঠিকাদারেরা। কিন্তু দুর্ঘটনার পর সিটি করপোরেশন বা ঠিকাদারের কেউ সেই শ্রমিকদের দায়িত্ব নিতে চায় না।

সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়ে কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ২০১৩ সালে পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি নীতিমালা প্রণয়ন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়োগকারীদের। ইমারত নির্মাণ আইন-১৯৫২, জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৬, ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা-২০০৮ প্রভৃতি আইন ও বিধানে নির্মাণশ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা আছে। এ ছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্মাণের সময় চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী দিতে হবে।

নগরীর এমন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কথা বলার যেন কেউ নেই। এ বিষয়ে জানতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল আমিনকে ফোন করা হলে, তিনি তো ফোনই উঠান না।
তবে, ফোন না উঠাক আর যে কথাই বলুক না কেন, দায়িত্ব কী এড়াতে পারবে এই নগর উন্নয়ন সংস্থার সংশ্লিষ্টরা। দেড় যুগ ধরে নগরীর দায়িত্বে যে তথাকথিত জনপ্রিয় মেয়র, তার কি এ বিষয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই? তার রহস্যময় ভূমিকার প্রশ্নের উত্তর নগরবাসীর কাছে অজানই রইলো।

0