শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবি: লা‌শের মি‌ছি‌লে আরও ৫, মোট উদ্ধার ৩৫

0

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: শীতলক্ষ্যায় যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির ঘটনার লা‌শের মি‌ছিল বে‌ড়ে চ‌লে‌ছে। দুর্ঘটনার আজ  ৩য় দিন মঙ্গলবার   সকালে আরও পাঁচজনের মরদেহ ভে‌সে উ‌ঠে। কয়লাঘাট এলাকা থেকে তাদের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়। করা হয়েছে।  এ নিয়ে মোট ৩৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হ‌লো।

মঙ্গলবার (৬ এ‌প্রির) সকালে এ তথ্য নি‌শিচত ক‌রেন নৌ পু‌লিশ।

এর আগে সোমবার পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়।

যেভাবে হলো এই ভয়ানক দুর্ঘটনা
দুর্ঘটনার সময়ের একটি ভিডিও চিত্র আমাদের হাতে এসেছে। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে যাত্রীবাহী লঞ্চটি মদনগঞ্জ এলাকায় নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর কাছাকাছি পৌছাতেই একটি বিশাল আকারের কার্গো জাহাজ এমভি সাবিদ আল হাসান নামের ছোট্ট লঞ্চটিকে পিছন থেকে ধাক্কা দিলে তলিয়ে যায়। এ সময় অনেক যাত্রীকেই নদী সাতরে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করতে দেখা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইএনও) নাহিদা বারিক জানান, ঘাতক কার্গো জাহাজটির নাম এসকে-৩। আমরা চেষ্টা করছি, জাহাজটি আটক করতে।

লঞ্চ দুর্ঘটনার সেই বর্ণনা দিয়ে বেঁচে ফেরা যাত্রী মো. মারুফ (১৭) জানায়, সোয়া ছয়টার দিকে লঞ্চটি নির্মিতব্য তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর কাছে পৌঁছায়। এ সময় পেছন থেকে বড় একটি কার্গো ধাক্কা দেয়। দোতলা লঞ্চটির নিচতলায় ছিল মারুফ। বাল্কহেডের ধাক্কায় লঞ্চটি কাত হয়ে গেলে মারুফ জানালা দিয়ে বের হয়। ধাক্কার পর নৌযানটি আধা মিনিটের মতো ভেসে ছিল, ততক্ষণ সে লঞ্চের ওপরই দাঁড়িয়েছিল। তখন লঞ্চের ভেতর থেকে অনেকেই তার পা জড়িয়ে ধরেন। কোনো রকমে পা ছাড়িয়ে সে নির্মাণাধীন সেতুর পিলার ধরে ভেসে থাকে। আমার মতো আরও অনেকেই ভেসে ছিল। পরে উদ্ধার করা হয়। চোখের সামনে বহু মানুষকে তলিয়ে যেতে দেখেন।

একে একে উদ্ধার ৩৫ লাশ
দুর্ঘটনার খবর পেলে নারায়ণগঞ্জ নৌ থানা, বন্দর থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌঁছায়। প্রচণ্ড বাতাস ও ঝড়ের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছিল তখন। ডুবে যাওয়া লঞ্চটির খোঁজে তিনজন ডুবুরিকে নামানো হলে সাথে সাথেই ১ নারীর লাশ উদ্ধার হয়। পরে লাশটি নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল) পাঠানো হয়। এর মধ্যেই প্রচুন্ড ঝড় ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে লঞ্চটির যাত্রীদের খোঁজে আসে স্বজনরা। বাতাস ও ঝড় কিছুটা কমার পর রাত ১২টা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে আরও ৪ নারীর লাশ উদ্ধার করে ডুবুরি দল। পরে রোববার দিবাগত রাত দুইটা পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে উপজেলা প্রশাসন স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে।

পরদিন সোমবার সকালে আবারও অভিযান শুরু হয়। স্বজনরা প্রিয় ব্যক্তির লাশের খোঁজে অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে। বেলা ১২টা পর্যন্ত ২ বার লঞ্চটিকে অর্ধেকের বেশি তোলা হলেও আবার ডুবে গেছে। পরে আবারও চেষ্টা করা হয়। শেষ পর্যন্ত বেলা সোয়া ১২টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজটি ডুবে যাওয়া লঞ্চ সাবিদ আল হাসান নামের লঞ্চটিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। লঞ্চের ভেতর থেকেই আরও ২১ লাশ উদ্ধার হয়। বিকালে সে লাশ গুলো হস্তান্তর করা হলে রাত ৮টা পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩০ জনে। মঙ্গলবার সকা‌লে আরও ৫টি লাশ ভে‌সে উ‌ঠে। মৃত্যুর মি‌ছি‌লে ৩৫ মর‌দেহ।

এ‌দি‌কে, সোমবার দুপুর ১২টায় লঞ্চটি উদ্ধারের পর সোয়া ১টায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেন বিআইডব্লিটিএর চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক।

লাশের পরিচয়
বিআইডব্লিউটিএর ফায়ার সার্ভিসের সবশেষ তথ্যমতে ৩০ জনের তথ্য বা প‌রিচয় জান‌তে পে‌রে‌ছে।

মুন্সিগঞ্জে কোর্টগাও এলাকার মুন্সীগঞ্জের উত্তর চর মসুরার পখিনা (৪৫), একই এলাকার বিথী (১৮) ও তার এক বছর বয়সী মেয়ে আরিফা, দোলা বেগম (৩৪), মুন্সীগঞ্জ সদরের রুনা আক্তার (২৪), মুন্সীগঞ্জের মোল্লাকান্দির সোলেমান বেপারী (৬০) ও তার স্ত্রী বেবী বেগম (৬০), মুন্সীগঞ্জের মালপাড়ার সুনিতা সাহা (৪০) ও তার ছেলে বিকাশ (২২), মুন্সীগঞ্জ সদরের প্রতিমা শর্মা (৫৩), মুন্সীগঞ্জের মোল্লাকান্দি চর কিশোরগঞ্জের মোঃ শামসুদ্দিন (৯০) ও তার স্ত্রী রেহেনা বেগম (৬৫), বরিশালের উটরা উজিরপুরের হাফিজুর রহমান (২৪), তার স্ত্রী তাহমিনা (২০) এবং এক বছর বয়সী শিশুপুত্র আবদুল্লাহ, মুন্সীগঞ্জের দক্ষিণ কেওয়ারের নারায়ন দাস (৬৫) ও তার স্ত্রী পার্বতী দাস (৪৫), নারায়ণগঞ্জের বন্দরের কল্যান্দী এলাকার আজমির (২) (ঘটনার সময় সে দাদা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে ছিলো, দাদা সাইফুল বেঁচে গেছেন), মুন্সীগঞ্জ সদরের শাহ আলম মৃধা (৫৫), একই এলাকার মহারানী (৩৭), ঢাকার শনির আখড়া এলাকার আনোয়ার হোসেন (৪৫), তার স্ত্রী মাকসুদা বেগম (৩০) ও তাদের ৭ মাস বয়সী মেয়ে মানসুরা, মুন্সীগঞ্জ সদরের ছাউদা আক্তার লতা (১৮), শরিয়তপুরের নড়িয়ার আবদুল খালেক (৭০), ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ার মোছাঃ জিবু (১৩), মুন্সীগঞ্জের খাদিজা বেগম (৫০), নারায়ণগঞ্জের বন্দরের দক্ষিন সাবদির নুরু মিয়ার ছেলে মোঃ নয়ন (১৯) ও সাদিয়া (১১)।

পৃথক দুই তদন্ত কমিটি
জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরীকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে বিআইডব্লিউটিএ, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও নৌ পুলিশের প্রতিনিধি এবং সদরের ইউএনওকে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) থেকেও পৃথক আরও একটি  তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সংস্থার নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিকেও কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছ ।

0