শীর্ষ রাজাকারের পুত্র নিয়ে রাজনীতির মাঠে আনোয়ার হোসেন

0

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: সর্বমহলেই তার বেশ সুনাম রয়েছে, একইসাথে তার হাত ধরে বহু নেতাকর্মীর সৃষ্টি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে রাজনৈতিক গুরু হিসেবে পরিচিত মহানগরের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। সম্প্রতি সেই গুরু বন্দরের এক রাজাকারের পুত্রের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকায় তৃণমূলে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক সমালোচনার। আর শীর্ষ নেতা‌দেরও র‌য়ে‌ছে ক্ষোভ। তারা বলছেন, ‘বর্তমানে রাজাকার পুত্রদের দৌরাত্ব সব জায়গায়’।

গত ১৯ জানুয়ারী বন্দরের মদনগঞ্জ বটতলার মোড়ে অনুষ্ঠিত ওই আয়োজনের সভাপতিত্ব করেন, ১৯ নং ওয়ার্ড বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক জসীম উদ্দীন জসু। এই জসুর পিতা ইসাক মিয়া ছিলেন মহান মুক্তিযোদ্ধের সময় শান্তি কমিটির নেতা।

নারায়ণগঞ্জের প্রবীন ৫ নেতার নাম আসলেই মহানগরের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এর নামটি ক্লিন ইমেজের, ভদ্র, মার্জিত হিসেবেই আসে। সেই নেতা যখন রাজাকারদের বংশধরদের নিয়ে রাজনীতির মাঠে থাকে, স্বাভাবিক ভাবেই আওয়ামী লীগ পরিবারে কষ্টের সীমা বেড়ে যায়। যদিও আনোয়ার হোসেন এর দাবি ‘জসু রাজাকার পুত্র এটা আমার জানার কথা না, জানি না’।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭১ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌর এলাকার বিভিন্ন ইউনিয়ন কমিটিতে (ইউসি) ১৪২ জন শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। একই সাথে ১৪ জনকে শান্তি কমিটি সমূহের আহবায়ক করা হয়। ওই ১৪ আহবায়কের এক হলেন জসীম উদ্দীন জসুর পিতা জনাব ইসাক মিয়া, যিনি সোনাকান্দা ইউসি ছিলেন।

১৯৭১ সালের ১১ই মে ‘এপিপি’র বরাতে দৈনিক আজাদ ১২মে ১৯৭১’র সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ি দেখা যায়, শান্তি কমিটির ১৪ আহবায়কের মধ্যে ১০ নম্বর তালিকায় জনাব ইসাক মিয়া এর নাম।  এ তথ্য মুনতাসির মামুন এর দলিল নির্ভর ‘শান্তি কমিটি ১৯৭১’ ইতিহাসের পুস্তক এর ২২৫ ও ২৯৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে।

এতোটা স্পস্ট অভিযোগ যার পিতার বিরুদ্ধে সেই জসীম উদ্দীন জসুও জানালেন, ‘আমার বাবা মুসলিম লীগ মাইন্ডের ছিল, বাপ-দাদা আমলের বেশিরভাগ লোকই মুসলিম লীগ মাইন্ডের আছিলো’। তবে, তার দবি ‘রাজাকার ছিলেন না’।

বন্দরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা সহ এলাকাবাসী যখন অভিযোগ করেন জসিম উদ্দিন জসুর পিতা জনাব ইসাক মিয়া রাজাকার ছিলেন। সেই সাথে ১৯৭১ এর দলিল পত্রও প্রমান করে শান্তি কমিটির নেতা ছিলেন। এর পরও প্রবীন রাজনীতিবিদ আনোয়ার হোসেনের এমন কান্ডে বইছে ক্ষোভ।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা হয়ে কিভাবে রাজাকারের সন্তানের আয়োজিত অনুষ্ঠানে যেতে পারেন? এবং কিভাবে বঙ্গবন্ধু জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক পদ পেলো ওই ব্যক্তি? এরকম প্রশ্নের উত্তরে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের জবাব, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন কমিটি বিভিন্ন ওয়ার্ডে যেগুলো গঠন করা হচ্ছে, সেগুলো আমরাই অনুমোদন দিচ্ছি। ১৯ নং ওয়ার্ডের সভাপতি জসু রাজাকার পুত্র এটা আমার জানার কথা না, জানি না।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় কমিটির সদস্য এ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু বলেন, ‘বর্তমানে রাজাকার পুত্রদের দৌরাত্ব সব জায়গায়। সব জায়গায় রাজাকার পুত্রদের মাতব্বরি। এ বিষয়ে আনোয়ার ভাই ব্যাখা দিবেন, তিনি আমাদের মুরব্বি’।

বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগ এর সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এমএ রশিদ এ বিষয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন কমিটি আমার আওয়াতায় না, আমি গঠন করিনি। রাজাকার পুত্র নিয়ে কমিটি গঠন সত্যি খুবই দুঃখজনক। এমন কেন হলো আমি তা বলতে পারছি না।

মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আনোয়ার ভাই আমার সভাপতি। উনি আমাকে অতিথি করেছেন, তাই আমি গিয়েছি’।

জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ্যাডভোকেট মাহমুদা মালা বলেন, ‘বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক। অনুষ্ঠানে আমাদের আইয়ুব ভাইসহ আরও অনেকে ছিলেন, তাদের দিয়ে সভাপতিত্ব করানো যেতো। আশা করি দলের নেতারা ভবিষ্যৎতে এ বিষয়গুলো খেয়াল করবেন’।

মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির মৃধা বলেন, ‘জসুর পিতা মুসলিম লীগের নেতা ও রাজাকার ছিল। জসু ৯৬ পর্যন্ত বন্দরে ছাত্রদলের দায়িত্বে ছিল। তার আওয়ামী লীগের অন্তর্ভুক্তি অশুভ লক্ষণ। এরকম কর্মকান্ড আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতিকর, সভাপতি সাহেবের মতো বিজ্ঞ নেতা এমন কাজ কি করে করেন’।

বন্দর ১৯ নং ওয়ার্ডের সন্তান ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বাবু বলেন, ‘জসুর বাবা রাজকার ছিল। আমাদের ১৯ নং ওয়ার্ড যতদিন সোনাকান্দা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল, ততদিন আমরা তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিষয়টি লক্ষ্য রেখেছি। কিন্তু বর্তমানে মহানগর আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষকতায় জসু অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে আশা করি মহানগর আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নিবে’।

উল্লেখ্য, ১৯ জানুয়ারীর বন্দ‌রের ওই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ হায়দার আলী পুতুল, সহ-সভাপতি ওসমান গনি ভূঁইয়া, সহ-সভাপতি মোঃ নুরুল ইসলাম চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস.এম আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক  জিএম আরমান, সাংগঠনিক সম্পাদক জি.এম আরাফাত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আইয়ুব আলী, বন্দর থানা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব আবেদ হোসেন, মহানগর যুব মহিলালীগ আহবায়ক নুরুননাহার সন্ধ্যাসহ আরও অনেকে।

0