সাবধান, ফুটপাত থেকে নামি দামি ব্র্যান্ড সব খাবারে ভেজাল!

0

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ: শিল্প নগরী নারায়ণগঞ্জ জেলায় খাদ্যপণ্যে ভেজাল বিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলেও থামছেই না ভেজাল পণ্যের বেচাকেনা।

ফুটপাত থেকে অভিজাত মার্কেটের সবখানে চলছে ভেজাল পণ্য বিক্রির মহোৎসব। জড়িতদের কারদন্ড ও অর্থদন্ড প্রদানেও এই ভেজাল পণ্য ও পচা-বাসি মালামাল তৈরী থেমে নেই। যার কারণে আতঙ্কে আছে আম জনতা। তার উপরে রমজান মাসে এই আতঙ্ক আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

মাছ-মাংস, ফল, সবজি থেকে শুরু করে ইফতারী পণ্য তথা ছোলা, দুধ, ঘি, ডালডা এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুরও দেধারছে বিক্রি হচ্ছে জেলার বিভিন্ন বাজারে। এর উপর দেশের ড্যানিশ, তীর এর মতো নামি দামি ব্যান্ডের ৫২ টি পণ্য বাজারে বিক্রি নিষেধ করেছে হাইকোর্ট।

খাদ্যে ভেজাল রোধ করতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থা পৃথক এবং যৌথ অভিযান পরিচালনা করে আসছে রমজান শুরুর আগে থেকেই। সেই অভিযান প্রতিদিনই অব্যাহত আছে। কিন্তু এতে মোটেও বন্ধ হচ্ছে না ভেজাল পণ্য বিক্রি ও সরবরাহ। এখন জনতার প্রশ্ন একটাই-‘কী রেখে কী খাবো?’

আম জনতার খাদ্য আতঙ্ক নিয়ে লাইভ নারায়ণগঞ্জের সাথে কথা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ ও জেলার পরিচিত মুখের সাথে। কীভাবে এ আতঙ্ক এড়ানো যায়, সে সম্পর্কে তারা জানিয়েছেন তাদের মতামত।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নিবার্হী কর্মকর্তা এ.এফ.এম এহেতাশামূল হক বলেন, জনসাধারনের জন্যে ভেজাল খাদ্য অনেকটাই বড় মাপের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যকে ভেজালমুক্ত করতে খাদ্য মাননিয়ন্ত্রণ আরও ভালো করতে হবে। খাদ্যমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই তা প্যাকেটজাত করতে হবে, এর আগে নয়। এভাবেই খোলা খাবার ও প্যাকেটজাত খাবারে পার্থক্য আসবে। নারায়ণগঞ্জে ভেজালমুক্ত খাবার নিশ্চিতে জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার দপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন এক হয়ে কাজ করতে হবে। হয়ে কাজ করলে এ সমস্যা দূর করা যাবে।

তিনি বলেন, ইফতার বাজারে যেসক খাবার আছে তার মান ঠিক আছে কিনা তার জন্যে তৃণমূল পর্যায়ে খাদ্য মান নিয়ন্ত্রণকারী দল গঠন করতে হবে। এ দল রেস্তোরা, হোটেলের, রাস্তার পাশে স্টলে যেসব খাবার বিক্রি হয় তার মান পরীক্ষা করবে। তাতে উত্তীর্ণ হলেই সে খাবার বিক্রি করতে দেওয়া হবে, তা না হলে ওই খাবার নিষিদ্ধ করা হবে। ক্ষুদ্র এলাকায় এই জেলাকে বিভক্ত করে একাধিক দল দিয়ে খাবার পরীক্ষা করাতে হবে। এমন দল গঠন হলে জেলায় খাদ্যের ভেজাল থেকে জনসাধারনকে মুক্তি দেওয়া যাবে।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যুথিকা সরকার বলেন, খাদ্যে ভেজাল রীতিমতই একটি বড় সমস্যা। নিজেরা কী খাবো, সন্তানদের কী খাওয়াবো এ নিয়েই দুশ্চিন্তায় ভুগছেন অনেকে। আমরা ম্যাজিস্ট্রেটরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ২৪ মে থেকে বাজারে অভিযান পরিচালনা করবো। সেই নিষিদ্ধ খাদ্যপণ্যের যে কয়টি পণ্য আমরা দোকানগুলো বিক্রি করতে দেখবো, সেখানেই ব্যবস্থা নেব। এছাড়াও, আমরা বিভিন্ন সংবাদের ভিত্তিতে রেস্টুরেন্ট, হোটেলে অভিযান চালাই। আসলে, কোন রেস্তোরায় ভেজাল খাদ্য মিলছে কীনা এমন তথ্য কারও কাছে থাকলে আমাদের জানাতে পারে। এতে করে আমরা ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযান চালিয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থা নিতে পারবো। তাইলে রেস্তোরা, খাদ্য পণ্য প্রস্তুতকারকরা সতর্ক হবে এবং আমরা ভেজালমুক্ত খাবার পাব।

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট খাদ্য ব্যবসায়ী ও জেড এন্ড টি রেস্টুন্টের মালিক শাহ নিজাম বলেন, কোন হোটেল থেকে খাচ্ছি, কী খাচ্ছি, দাম অনুযায়ী কাবারের মান কত? এসব প্রত্যেকেই বিবেক দিয়ে নির্ধারণ করতে হবে। যে জায়গা থেকে একজন নাগরিক খাবার পণ্য ক্রয় করছেন তা ভেজালযুক্ত হলে, বর্জন করতে হবে। মূলত যে জায়গায় ভেজাল খাবার মিলবে তাই বর্জন করতে হবে। এতেই ভেজালযুক্ত খাবার থেকে জনগণ মুক্তি পাবে।

এ ব্যাপারে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে ভেজালমুক্ত খাদ্য নাগরিকদের হাতে পৌছে দেওয়া যাবে। সরকার তদন্ত করে ভেজাল খাদ্য যারা তৈরী করে তাদের শনাক্ত করতে পারে। সেই ভেজাল তৈরীকারকদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে করে ভেজাল খাদ্য বানানো বন্ধ হবে।

এ ব্যাপারে বিকেএমইএ এর পরিচালক জি এম ফারুক বলেন, প্রতিনিয়ত খবরের চ্যানেল, পত্র-পত্রিকায় খাদ্যে ভেজাল নিয়ে যে কথা হচ্ছে, তাতেই বোঝা যাচ্ছে ভেজাল খাদ্য আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। একটি নবজাতক থেকে শুরু করে সমাজের বয়স্ক ব্যক্তি কেউ নিরাপদ নয়। ভেজাল খাদ্যের কারণে মানুষ আজ ক্যান্সার, ব্রঙ্কাইটিস এর মতো ঘাতক ব্যাধিতে আক্রন্ত হচ্ছে। দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে এই ভেজাল খাদ্য দমন করতে হবে। শুধু রোজার মাসেই ভেজাল খাদ্য নিয়ে কাজ নয়, সারাটা বছর কাজ করতে হবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত এর শেস হয়। নামি-দামি কোম্পানি থেকে শুরু করে ছোট্ট কোম্পানির খাদ্য মান ঠিক আছে কীনা তা পরীক্ষা করেই জনসাধারনের হাতের নাগালে তা দিতে হবে। তাই দ্রুত ভোজলখাদ্য বন্ধ করতে সরকার পদক্ষেপ নিবে বলে আবেদন করছি।

তিনি আরও বলেন, ভেজাল খাদ্যপণ্য বন্ধ করতে আরেকটি বড় নিয়ামক হলো আমাদের মানসিকতা। আমাদের মন-মানসিকতা ভালো করলে আমরা যারা খাদ্যপণ্য প্রস্তুত করি, তারা খাদ্যে আর ভেজাল মেশাবো না।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের সহকারী পরিচালক ও নারায়ণগঞ্জে অতিরিক্ত দায়িত্বরত কর্মকর্তা আসিফ আল আজাদ বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিদিন প্রতিটি জেলায় বাজার মনিটরিং করছে। যেসকল দোকানে ভোক্তা অধিকার আইন লঙ্ঘন করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যেসকল খাদ্য পণ্য বিএসটিআই এর পরীক্ষায় উত্তির্ণ হয় না, সে সকল পণ্য পরিহার করতে হবে। বাজারে সেই পণ্য থাকলেও নাগরিকদের তা কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সকলের উচিৎ বাইরের খাবার পরিহার করা। হোটেল, রেস্তোরা যে কোন বাইরের খাবার যত মুখরোচক, সুস্বাদু মনে হোক না কেন তা খাওয়া চলবে না। এই সব খাবার পরিহার করে বাড়ির রান্না করা খাবার খেলে সুস্থ থাকা যাবে।

0