সেই ‘বোবা সিরাজ’র মৃত্যুর জন্যে দায়ী সামাজিক সমস্যা

0

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ: সিদ্ধিরগঞ্জে নিজের সন্তানকে দেখতে গিয়ে নির্মম গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা যান বাক প্রতিবন্ধী সিরাজ। যেন সন্তানকে দেখতে চাওয়া অপরাধ ছিলো তার।

পেছনের ঘটনা

ভোলা জেলার লালমোহন থানার মুগিয়া বাজার এলাকায় আ. রশিদ মন্ডলের ৭ সন্তানের মধ্যে সিরাজ সবার বড়। ১০ বছর আগে সামসুন্নাহারকে বিয়ে করেন সে। গ্রামে কাজ না পাওয়ায় ২০১৫ সালে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে আসেন সিরাজ। ভাড়া নেন সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলোগেইট এলাকায় মোহর চানের বাড়িতে। রাজমিস্ত্রির সহকারীর (যোগালী) কাজ করতো সে। তার স্ত্রী বাসা বাড়িতে গৃহস্থালি কাজ করতেন।

পরকীয়া

সিদ্ধিরগঞ্জে আসার পর সিরাজের স্ত্রী সামসুন্নাহারের উপর চোখ পড়ে বিদ্যুৎ মিস্ত্রী মান্নান ওরফে সোহেলের। দিনে দিনে তা রূপ নেয় পরকীয়ায়। প্রায় আট মাস আগে একমাত্র মেয়ে মিনজিকে নিয়ে সামসুন্নাহার ওই বিদ্যুত মিস্ত্রির সাথে পালিয়ে যায়। কিছু দিন পর সিরাজের কাছে তালাকনামা পাঠায় সামসুন্নাহার।

চাপা কষ্ট

জন্ম থেকেই বোবা হওয়ায় কষ্টে বুকের ভেতরটা ফেটে যেতো সিরাজের। তবে মেয়ে মিনজির কথা শুনে তার মন জুড়িয়ে যেতো। ছোট্ট মেয়েটিকে সব সময় চোখে চোখে রাখতো সে। সেই আদরের মেয়েকে নিয়ে যখন স্ত্রী অন্যের সংসারে উঠে তখন বুকের কষ্টটা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায় সিরাজের। বোবা হওয়ায় তা কারও কাছে প্রকাশ করতে পারতো না। তবে কাজের ফাঁকে চুপে চুপে মেয়ে আর স্ত্রীকে খুঁজে বেড়াতো।

সন্তানের সন্ধান

অনেক দিন খোঁজার পর সিরাজ তার আত্মার আত্মজের সন্ধান পায়। জানতে পারে, সিদ্ধিরগঞ্জেই তার স্ত্রী নতুন স্বামীকে নিয়ে বাস করে। তাদের কাছেই আছে তার মেয়ে মিনজি। শনিবার প্রতিবেশী একজনের কাছে ১শ’ টাকা ধার নিয়ে কণ্যার জন্য বিস্কুট, চিপস, লিপিস্টিক ও চুড়ি কিনে। এরপর ঠিকানামতো গিয়ে মেয়ের হাতে তুলে দিতে পেরে খুব খুশী হয় সে। অনেক দিন পর মেয়েকে দেখতে পেরে মনের চাপা কষ্ট অনেকটা দূর হয়ে যায় সিরাজের। তবে সে ঘুর্নাক্ষরেও জানতে পারেনি একটু পর তার জন্য কি নির্মম যন্ত্রনা অপেক্ষা করছে।

গণপিটুনির ইন্ধনদাতা

শনিবার সকালে মেয়েকে দেখে ফেরার পথে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পূর্বপাড়া আল-আমিন নগর এলাকায় ‘শিশু ধরা’ সন্দেহে একদল পাষন্ড মানুষ বোবা সিরাজকে বেঢড়ক মারধর করে। অসংখ্য মানুষের প্রচন্ড মারধরে মারা যায় সিরাজ। ওই সময়ে অজ্ঞাত হিসেবে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে পরিচয় উদঘাটন হলে সব রহস্য বের হয়ে আসে।

সিরাজের ভাই আলম জানান, সাবেক স্ত্রী ও তার নতুন স্বামী সিরাজকে ‘শিশু ধরা’ বলে জনতাকে উত্তেজিত করে তুলে। আর লোকজনগুলোও কোন যাচাই না করে মারতে শুরু করে সিরাজকে।

নিহত সিরাজের পরিবারের সদস্যদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, সিরাজ খুব সহজ সরল মানুষ ছিলেন। বোবা হলেও কারও বোঝা হতে চাননি তিনি। তাই নিজে কোন না কোন কাজ করতেন। তার স্ত্রী চলে অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে যাওয়ার পর খুব কষ্ট পান। সবচেয়ে বেশী কষ্ট পেয়েছেন নিজের সন্তানের মুখ না দেখতে পেরে। সন্তানকে দেখতে গিয়েই শনিবার গণপিটুনির শিকার হন সিরাজ।

সূত্র মতে, সমাজে নানা কারনে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে। সচেতন মহলের মতে, বিবাহ বিচ্ছেদের যেসব কারণ রয়েছে তার মধ্যে পরকীয়ার মতো সম্পর্ক অন্যতম। পরকীয়ার টানে অনেক সংসার ভাঙ্গছে। আলাদা হয়ে যাচ্ছে স্বামী-স্ত্রী। কোন কোন সময়ে সন্তানদের একজন নিয়ে যায় আর অন্যজন সন্তানের মুখ দেখতে পাগল প্রায় হয়ে যায়। এভাবে সন্তান দেখার আকুতি দিন দিন বাড়ছে ।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এসব বিষয়ে নতুন করে আইন করা দরকার। বিচ্ছেদ হলে সন্তান কার কাছে থাকবে সেক্ষেত্রে অন্যজন কিভাবে সন্তানকে দেখতে পাবে তা নিয়ে সহজ আইন দরকার। অতীতে এমন ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এর জন্য পারিবারিক আইনও আছে। তবে সব কিছু খোলাসা করে নতুন আইন হলে কিছুটা হলে সমস্যা কমবে। আবার কারও কারও মতে, পরকীয়ার কুফল জাননোর জন্য প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো উচিত।

0