স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে অসম্মতি, এসিডের শিকার ‘মোহসেনা’আজ জয়িতা

0

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জে আলোচনা সভা ও জয়িতাদের সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। ৯ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে এ আয়োজন করা হয়। এসময় নারায়ণগঞ্জের ৫নারীকে জয়িতা হিসেবে সম্মাননা প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক(ডিসি) মো.জসিম উদ্দিন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(ডিএসবি) মোহাম্মদ শফিউল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ বেসরকারি ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি এবং বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) নারায়ণগঞ্জ জেলার সাবেক সভাপতি ডা. শাহনেওয়াজ চৌধুরীসহ নারায়ণগঞ্জ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দসহ আরও অনেকে।

‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কার্যক্রম-২০২০ এর আওতায় নারায়ণগঞ্জ জেলায় নির্বাচিত জয়িতারা হলেন- অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী পারভীন আক্তার, শিক্ষা ও চারী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী লুবনা তাবান্নুম, সফল জননী নারী আসলাম আখতারী, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা মোহসেনা বেগম, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখায় নূর জাহান।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মো.জসিম উদ্দিন বলেন, মোহসেনা বেগম একবার নয় বার বার নির্যাতিত হয়েছেন। সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ অনেক কিছু নিয়েই তো নিউজ করেন, কাকে খোঁচা মারবেন কাকে ধরবেন, এই মাকে নিয়ে নিউজ করেন। যারা নির্যাতন করতে এসিড দিয়ে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, তাদের নিয়ে করেন। প্রধানমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জের যাদেরকে জয়িতা করেছেন তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। অনেক পেশায় আমরা মেয়েদের দিচ্ছি না কারণ কেন, কিভাবে কাজ করবে তা ভাবি। রোকেয়া আমরা আজও বিভিন্ন জনের মাঝে খুঁজে পাই। আমার মা-চাচীদের মাঝেও রোকেয়াকে খুঁজে পাই, দূরে বসেও তারা যে সিদ্ধান্ত দেয় সেগুলো আমাকে অনুপ্রেরণা জাগায়। বড় সমস্যায়ও যখন মা মাথায় হাত দিয়ে যদি বলে বাবা সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, তখন আবারও ঘুরে দাঁড়াবার সুযোগ পায়। অথবা, ভালোবাসার স্ত্রী যখন বলে ‘তুমি চিন্তা করো না সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে নাও এখন খেতে বসো। তখন, মহামারী দূর্যোগেও সাহস পায় স্বামীরা ।

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা মোহসেনা বেগম জীবনী পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো-

আমি মোহসেনা বেগম, পিতা: হাজী আব্দুল হামিদ মাস্টার, স্বামী- এ সাত্তার প্রধান, মাতা: আমেনা বিবি, গ্রাম: বৈলারকান্দী, ওয়ার্ড আবু নং: ০৯, ইউ: ব্রাহ্মন্দী এর একজন স্থায়ী বাসিন্দা। আমার ২ ভাই ২ বোনকে নিয়ে বাবা যখন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার প্রত্যয় নিয়ে। এগিয়ে যাওয়া শুরু করেন ঠিক তখনই আমার ৪ বছর বয়সে আমাদের পরিবারকে নিঃস্ব করে চলে যান না ফেরার দেশে নাবালক বড় ভাই তখন সংসারের দায়িত্ব হাতে তুলে নেন। আমাদের ৪ ভাই-বোনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভাইয়ের পাশাপাশি আমার মা ও হিমশিম খেতে থাকে। ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করি এবং আরবি শিক্ষায় দীক্ষিত হই। পড়াশোনা করার প্রচন্ড মানসিকতা থাকা সত্বেও অর্থের অভাবে তা চালিয়ে যেতে পাড়ি নাই। তাই নিজের জীবন গড়ার স্বপ্ন চাপা দিয়ে ১৬ বছর বয়সে পরিবারের পছন্দ মত দরিদ্র ঘরের ছেলের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। ছেলের বাবা-মা নিজে পছন্দ করে বিয়ে করিয়ে নিয়ে গেলেও বিয়ের পর দিনই শুরু হয় নির্যাতন।

নতুন পরিবেশে নতুন স্বপ্ন নিয়ে নতুন যাত্রা। আমার স্বামী জাকারিয়া ব্রাহ্মদী ইউনিয়নের ঝাউগায়া গ্রামের বাসিন্দা ছিল। বিয়ের পর সে। ৫০,০০০ টাকা যৌতুক দাবী করে। ৫০,০০০ টাকা যৌতুক না দিতে পারায় আমার স্বামী প্রায়ই আমাকে শারীরিক নির্যাতন করত। প্রথম অবস্থায় আত্নীয়-স্বজন আমার স্বামীকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা। করে কিন্তু তার কোন উন্নতি হয় নাই। যৌতুকের টাকা না দিতে পারায় শারীরিক নির্যাতন করত অনেক সময় খাবারের কষ্ট ও দিত। পরবর্তীতে জানি সে অন্য মেয়ের সাথে ও সম্পর্কে লিপ্ত, তখন সে। আমাকে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য সম্মত করতে চায়, আমি সম্মতি না দেয়ার কারণে সে আমাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকে এবং অনবরত টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে। তার নির্যাতনের পরিমান এতটাই তীব্র ছিল যে, আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি তা বুঝতে পারতাম না। তার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আমি বাড়ি চলে আসি। আমি বাড়ি চলে আসায় সে ক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং পরের দিন খুব সকালে আমাদের বাড়িতে এসে আমার রুমের জানালা দিয়ে আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় আমার মুখে এসিড ঢেলে দিয়ে পালিয়ে যায়।

তারপর আমার পরিবার আমাকে চিকিৎসা করে ভালো করেন। পরবর্তীতে আমার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। ছোট বিনাইচর আমের আবু সাত্তার প্রধানের সাথে। তিনি ও তার প্রথম বিয়ে গোপন করে আমাকে বিয়ে করেন। এমনকি তার প্রথম সংসারের ২ ছেলে ও ১ মেয়ের কথাও আমাদের কাছে গোপন করেছিল। আমার নিজেরও ২ টি কন্যা সন্তান হয় । কিন্তু স্বামী তাদের ভরন পোষনের কোন দায়িত্ব না নিয়ে এড়িয়ে চলে। তারপর থেকে আমি নিজেই সেলাই কাজ করে নিজের বৃদ্ধা মা ও মেয়েদেরকে নিয়ে সংসার চালাতে শুরু করি। অনেক কষ্টে আমিও নিজেও স্বাবলম্বী হয়েছি এবং মেয়েদেরকেও লেখাপড়া করিয়েছি। বর্তমানে আমার বড় মেয়ে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে এবং তাকে বিয়ে দেই আর ছোট মেয়ে এখানে লেখাপড়া করছে। আজ আমি এসিড আক্রান্ত হয়েও ভেঙ্গে পড়িনি। এসিড আক্রান্ত হওয়ার কারনে অনেক ক্ষেত্রে নানা সমস্যার সম্মুখীন হই। তারপরও থেমে থাকিনি। প্রতিদিন বাঁচার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলেছি। নিজেও স্বাবলম্বী হয়েছি। এবং অন্যদেরকে ও স্বাবলম্বী হওয়ার উৎসাহ প্রদান করেছি।

0