আদরের কিশোররা হাঁটছে বিপথে

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: এক সময় কিশোরের দল, ছেলে-বুড়ো সবার কাছে ছিল আদরের। ৯০ দশকে সেই কিশোরদের নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিলো বিখ্যাত সিরিজ ‘তিন গোয়েন্দা’। কিন্তু বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে কিশোর একটি বড় আতঙ্কের নাম। দিন দিন শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত হচ্ছে ১৪ থেকে ১৭ বয়সী ছেলেদের সংঘবদ্ধ অপরাধপ্রবণতা, যা ভবিষ্যতের জন্য স্পষ্ট হুমকিস্বরূপ। সম্প্রতি চাঁনমারি এলাকায় তাদের নৃশংসতায় প্রাণ হারিয়েছে ১৬ বছর বয়সি সজীব। সচেতন মহলের মতে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, তা না হলে কিশোরদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোর অপরাধ অনেকটাই সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। তারা বড়দের সাথে অসদাচরণ থেকে শুরু করে, সহপাঠী কিংবা বন্ধুদের সাথে মারামারি, তীব্র গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, অশ্লীলতা, ইভটিজিং এবং ছিনতাইয়ের পাশাপাশি জড়িয়ে পড়ছে খুন ও ধর্ষণের মতো দুর্ধর্ষ সব অপকর্মে। আবার ধূমপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের সাথে সাথে মাদক ব্যবসার সাথেও বাড়ছে তাদের একাংশের সংশ্লিষ্টতা।

সবশেষ ৩১ জুলাই রাত সাড়ে সাতটার দিকে চাঁনমারী নীট হাউজের সামনে কিশোরদের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এসময় এক পক্ষের ছুরিকাঘাতে মৃত্যু হয় সজীবের। একই মাসের ২৭ জুলাই রাতে সিদ্ধিরগঞ্জে বাগমারা এলাকায় ৮-১০ জন ‘কিশোরের’ সঙ্গবদ্ধ হামলায় প্রাণ হারায় ১৭ বছর বয়সী কলেজের ছাত্র ইমন।

এর আগে এ বছরের মে মাসের শুরু থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত কিশোরদের হামলায় খুন হয়েছে তিনজন। আহত হয়েছে আরও কয়েকজন। একই মাসের ১৬ তারিখ রাতে দেওভোগ এলাকার সুব্রত মন্ডলকে মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাত করে বাসার সামনে ফেলে যায় একদল কিশোর। হাসপাতালে নেয়ার ছয় দিন পর মারা যায় সুব্রত। এ ঘটনার এক দিনপর ১৭ মে ফতুল্লার ইসদাইর এলাকায় সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে খুন হয় দশম শ্রেণির ছাত্র দ্রুব চন্দ্র দাস। জানা যায়, এই হত্যার সঙ্গে জড়িতরাও স্কুল পড়ুয়া ছাত্র।

এদিকে, গত ১৪ মে ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দর থানা এলাকায় ৩টি হামলার ঘটনা ঘটে। এসব হামলায় দেওভোগ পানির ট্যাঙ্ক এলাকায় মিরাজুল ইসলাম দিপু, সিদ্ধিরগঞ্জে কলেজ শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন রিয়াদ ও বন্দরে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম রিফাত ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঘটনার সাথে জড়িতরা বেশির ভাগই ছিলো কিশোর বয়সের। ১৩ মে রাতে নগরের গলাচিপা বোয়ালিয়া খাল এলাকায় কিশোরদের হামলায় গুরুতর আহত হন দৈনিক অগ্রবাণী পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক রশিদ চৌধুরী ও পথচারী মো. জসিম।

গত ৬ এপ্রিল সকালে ফতুল্লার ইসদাইর বাজার এলাকায় শামীম নামের এক যুবককে ডেকে এনে প্রকাশ্যেই কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা। ২৫ এপ্রিল ফতুল্লার মাসদাইর শেরেবাংলা সড়কে এক গার্মেন্টস শ্রমিককে ছুরিকাঘাত করে হত্যা হয়। আর এই দুই খুনের সঙ্গে জড়িতরা অধিকাংশ কিশোর বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা। একই মাসের ৩ তারিখ নগরীর জামতলা কেন্দ্রীয় ঈদগাহর সামনে কিশোরদের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয় সাংবাদিক শরীফ উদ্দিন সবুজের ছেলে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আহমেদ অন্ত।

গত বছরের ১৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতার জেরে মো. ইমন নামে এক যুবককে জবাই করে হত্যা করা হয়। ওই বছরের ২৯ জুন চাষাঢ়ায় রেলস্টেশন এলাকাতে মাদকের স্পট নিয়ে বিরোধে কিশোরদের ২ গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত হন রাজমিস্ত্রী রুবেল।

২০২০ সালের ১০ আগস্ট বন্দরের ইস্পাহানী ঘাট এলাকায় কিশোরদের ২ দলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় এক পক্ষের ধাওয়ায় আত্মরক্ষার্থে শীতলক্ষ্যা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মারা যায় মিহাদ ও জিসান নামে দুই শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই ফতুল্লার দেওভোগ হাশেম নগর এলাকায় মোটরসাইকেলের লাইটের আলো চোখে পড়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে শাকিলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই বছরের ৩১ জুলাই ফয়সাল নামে এক কিশোর শহরের খানপুর বরফকল এলাকায় বান্ধবীর মোবাইল ফোন ফিরিয়ে দিতে গেলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে পাঁচ কিশোর।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ‘অল্প বয়সেই ছেলেরা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনির সাথে । এদের‘কিশোর’বলা হলেও মূলত এসব গ্রুপে কৈশরের বয়স অতিক্রম করেছে, এমন সদস্যরাও রয়েছে। এদের মধ্যে যেমন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে, তেমনি আছে অছাত্ররাও। এছাড়া বিভিন্ন সময় কিশোরদের অস্ত্র বহন ও ব্যবহার সহ নানা অপরাধ মূলক কর্মকান্ডের নানা তথ্য, ছবি ও ভিডিও চিত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতে দেখা গেছে ।

এ ব্যাপারে শহরের কয়েক জন কিশোরের সাথে কথা হলে তারা জানায়, স্থানীয় প্রভাবশালী ও নেতাদের সাথে রয়েছে তাদের ভালো সম্পর্ক। আর নেতাদের সংস্পর্শে থাকলে তাদের কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না । এছাড়া এলাকার বড় ভাইদের ক্ষমতা বলে তারা পুরো মহল্লা দাপিয়ে বেরায়।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল বলেছেন, কোনো কিশোর পরিবার থেকে খারাপ হয় না। কারণ কোন পরিবার চায় না, তাদের সন্তান খারাপ হোক। ফলে এই বাচ্চাটার একটা আলাদা পরিবার ও আলাদা জগত আছে। যাদের সাথে মিশে সে খারাপের দিকে যায়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কেনো যায়? সেটা হলো, একটা বাচ্চাকে যদি শিশুকাল থেকে একটি ভালো পরিবেশ দিতে না পারি, তা হলেতো সে খারাপের পথে যাবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জসহ সারা বাংলাদেশে খেলার মাঠের সংকট। প্রতিটা স্কুলের মাঠগুলো বন্ধ করে রাখা হয়। বাচ্চাদের মধ্যে কোন সংস্কৃতিচর্চা নেই। ফলে কিশোররা কৈশরের পরিবেশ নষ্ট করে ফেলছে।
তিনি বলেন, কিছু রাজনৈতিক মাস্তানরা তাদেরকে অপব্যবহার করছে। এই জন্যই কিশোররা গ্যাং কালচারের দিকে যাচ্ছে। তবে কিছুটা দায় পরিবারেরও আছে, আবার একই সাথে সমাজেরও আছে। সরকারের উচিৎ তাদের জন্য পর্যপ্ত খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিকচর্চা ও শরীরচর্চার ব্যবস্থা করা, আর তা না হলে এরকম বখাটেপনা দিন দিন বাড়বে।

নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেছেন, কিশোর অপরাধ শুধু নারায়ণগঞ্জ না সারা বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। নারায়ণগঞ্জে পরপর কয়েকটা খুন হলো। আর এই সবগুলো খুনের সাথেই কিশোর জড়িত। কিছু কিছু বড় ভাই ও গডফাদার আছে যারা তাদের লালন পালন করে।
তিনি বলেন, অপরাধ করার পরে এরা আইনগত একটি সুবিধা পায়, কারণ তারা কিশোর। জেলের পরিবর্তে তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এতে খুনের যে শাস্তি, সেটা হালকা করে দেখা হয়, আইনের চোখে । এই সুবিধাটা কিন্তু সন্ত্রাসীরা নিচ্ছে। নিজেরা পারে না, তাই কিশোরদের উপর ভর করে চলছে তারা। আর আইন সৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয় বলেই কিন্তু এটা হচ্ছে। বিভিন্ন থানা গুলোতে এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। আর কেনো পারছে না, এটা তারাই ভালো বলতে পারবে। এ ধরনের ঘটনা যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে এই জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে। পাশাপাশি সকলকে সচেতন হতে হবে। অপরাধ দমনে সবাইকে একসাথে মিলেমিশে কাজ করতে হবে।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেছেন, প্রতিটি পরিবারের বাবা মাকে তার সন্তানের নিয়মিত খোঁজ খবর রাখতে হবে। ছেলে কোথায় যায় কার সাথে মেশে ও কি করে, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। তা হলেই এই কিশোর অপরাধ আস্তে আস্ত অনেকটা কমে যাবে।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিচুর রহমান বলেছেন, আমরা সব সময় অভিযান পরিচালনা করছি। যারাই অপরাধের সাথে জরিত তাদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করছি । নারায়ণগঞ্জকে অপরাধ মুক্ত করতে আমাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি নাই । আমরা পর্যাক্রমে কাজ করছি।