এনসিসি’র অর্থ-সামর্থ্য থাকার পরেও মেলেনি কাংখিত স্বাস্থ্য সেবা

0

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: ‘হঠাৎ বুকের ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন বাবা। কি করবো বুঝে উঠতে পার ছিলাম না। দ্রুত নিয়ে গিয়েছিলাম জালকুড়ির একটি ক্লিনিকে। সেখানে চিকিৎসা না পেয়ে ৪ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয় ঢাকায়’।

জুলাই মাসের লকডাউনের মধ্যরাতের ভয়ানক স্মৃতি বলতে গিয়ে চোখে পানি চলে আসে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের বাসিন্দা মামুনের।

৯ বছরের মেয়ের পেট ব্যথা নিয়ে একই রকম পরিস্থিতি হয়ে ছিল সিটি করপোরেশনের কদম রসূল অঞ্চলের শাহ্ আলমের। নদী পাড়ি দিয়ে শহরে আসলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা না পেয়ে রাজধানী ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়েছিল।

শুধু মামুন বা শাহ আলমই নয়, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার এমন অনেক মামুন-শাহ্ আলমকে চিকিৎসার জন্য ছুটতে হচ্ছে রাজধানীতে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যেখানে সারাদেশের স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করছে সরকার। সেখানে এই দেশের অন্যতম জনসংখ্যা বহুল এলাকা নারায়ণগঞ্জ সিটি চলছে উল্টো পথে। এই শহরের ৮ লাখেরও বেশি মানুষের ভাগ্য বদলানোর দায়িত্বে দীর্ঘ ১৮ বছর থেকেও তেমন পরিবর্তন আনতে পারেনি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এমনটাই অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।

নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতাল (ভিক্টোরিয়া) ও খানপুরের ৩শ শয্যা হাসপাতাল বিশাল জনগোষ্ঠির সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। যেখানে সিটি করপোরেশন এর পক্ষ থেকে ভালো মানের জনসেবায় স্বাস্থ খাত অবহেলিত। এ বিষয়টি নগরবাসীকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে করোনাকালের দুঃসময়।

নিজেস্ব অর্থ আর স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বদলে দেওয়ার মতো অবস্থা থাকার পরেও ৩’টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ১ মাতৃসদন প্রতিষ্ঠা ছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ঝুলিতে আর কিছুই নেই। যদিও বুলিতে রয়েছে অনেক কিছু।

সিটি করপোরেশনের ৪টি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ৪ জন সিনিয়র মেডিকেল অফিসার, ৪ জন মেডিকেল অফিসার ও শিশু বিশেষজ্ঞ রয়েছে। প্রজেক্ট ম্যানেজার রয়েছে ১ জন এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্তকর্তাসহ ১০-১২ জন কর্মকর্তা রয়েছে হাসপাতাল গুলোতে। এর জন্য বরাদ্দ রয়েছে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু সেবার ফলাফল কতটুকু? নগরবাসীর মতে ‘একেবারেই শূণ্য’।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রকাশিত বাজেট তথ্যে উল্লেখ্য করা আছে- ‘মাতৃসদন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র’ এর জন্য ২০১৯-২০ অর্থ বছরে প্রায় ১কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থ বছরে সেই খাতে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ করা হয় ২কোটি ১৫ লাখ টাকা। যা সর্বশেষ এ বছর বাজেটে ২কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, এ টাকার বিনিময়ে কি সেবা পেল নগরবাসী?

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ জানান, জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে, যে কোন সমস্যায় নগরবাসীর প্রধান ভরসা নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল ও খানপুরের ৩‘শ শয্যা। এখান থেকে ব্যর্থ হলে চলে যেতে হয় রাজধানী ঢাকায়। আর ক্লিনিক গুলোর উচ্চমূল্যে স্বল্প সেবা নিতে গিয়ে নগরবাসী বসছে পথে। এছাড়া বিশ্ব মহামারী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত জেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সিটি করপোরেশনের বাসিন্দারা।

২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইনের ১১২ ও ১১৩ ধারা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় সংস্থাটির নিবন্ধন ব্যতিত কোন প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনোষ্টিক সেন্টার, প্যারামেডিক্যাল ইনস্টিটিউট পর্যন্ত পরিচালনা করতে পারবে না। কর্পোরেশন নগরীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য দায়ী থাকবে এ সম্পর্কিত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করার থাকলে, সেটিও গ্রহণ করতে পারবে।

এছাড়া নগর বাসীর মান সম্পন্ন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষে একটি আধুনিক দক্ষ ও কার্যকরী ইউনিট গড়ে তোলার কথা উল্লেখ রয়েছে তাদের সেবার তালিকায়। যেখানে থাকতে পারতো প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা, ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা সাহায্য ইউনিট স্থাপন ও পরিচালনা, চিকিৎসা বিদ্যার উন্নয়ন, স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা।

নগরীর সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, এর জন্য প্রয়োজনে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও করতে পারেন সংস্থাটি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মাতৃসদন প্রতিষ্ঠা, নারী-শিশু-কিশোরদের জন্য কল্যাণকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনা, ধাত্রী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, করপোরেশনের স্বাস্থ্যমূলক শিক্ষাসহ জনস্বাস্থ্যের উন্নতির বিধান কল্পে প্রয়োজনীয় যে কোন ব্যবস্থা গ্রহণও দায়িত্বের আওতাধীন পড়ে।

স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে নিজ দলেরই সমর্থনে নির্বাচিত মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে খোদ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ্ নিজাম প্রশ্ন রেখে বলেন, নারায়ণগঞ্জবাসী বিগত ১৮ বছর কি নাগরিক সুবিধা পেয়েছি? স্বাস্থ্যসেবা পাইনি। একটা আধুনিক হসপিটাল করা হয়নি সুচিকিৎসার জন্য। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি আমরা আমাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

করোনা ভাইরাসের এই ভয়াবহ দুঃসময়ে নগরবাসীর পাশে ছিল না এই সংস্থার মেয়র আইভী। সরকারের দেওয়া অনুদান বিতরণ ছাড়া সংস্থার কোন উদ্যোগের কার্যক্রমই দেখা যায়নি এই শহরে। বরং স্বাস্থ্য সেবা করতে সহযোগীতা চেয়ে ব্যর্থ হয়ে ফেরার অভিযোগ রয়েছে এই জেলার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের। আর অসহায় মানুষ গুলো আশা নিয়ে খাদ্য সহযোগীতার প্রত্যাশা করেও হয়েছেন লাঞ্ছিত। বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছেন রাস্তায়। এমন বিস্তর অভিযোগ জন সাধারণের।

তাহলে কী করছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন? এমন প্রশ্নে জবাবে সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য খাতের প্রধান ও মেডিকেল অফিসার নিয়মের কথা গুলো স্বীকার করে ডা. শেখ মোস্তফা আলী জানান, আপনার সাথে কথা বলতে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। তাছাড়া কোভিড বিষয়ে আমাদের মুখপাত্র হলো প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। আর কোভিডের বাহিরে কথা বলতে গেলে সেখানেও লাগবে প্রধান নির্বাহী ও মেয়রের অনুমতি।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল আমিনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিসের প্রতিবেদন বলছে, জেলার কোভিডে মোট আক্রান্তের সংখ্যা এক-চতুর্থাংশ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে এবং মৃত্যুর সংখ্যা মোট মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশের বেশি৷

0