ডিআইটি ব্যবসায়ী সংগঠনের ফাঁদে সর্বস্বান্ত ব্যবসায়ী, ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

0

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: জায়গাটির মালিক ছিল রাজধানী উন্নয়ণ কর্তপক্ষ (রাজউক)। আর রাজউকের অগোচরেই সেই জায়গায় অবৈধভাবে দোকান ঘর নির্মান করে এক বস্ত্র ব্যবসায়ীকে ভাড়া দিয়ে তাঁর নিকট থেকে অগ্রিম জামানতসহ দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর যাবত দোকান বাবদ মাসিক ভাড়া আদায় করে নিচ্ছিল ভাড়া প্রদানকৃত একটি ব্যবসায়ী সংগঠন।

কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই রাজউকের জায়গায় অবৈধভাবে নির্মিত দোকান ঘরটি পরিদর্শনে এসে রাজউকের কর্মকর্তা দোকান মালিককে মাসিক ভাড়া পরবর্তী সময় থেকে রাজধানী উন্নয়ণ কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ঢাকা এর বরাবর মৌখিক ভাবে প্রদানের নির্দেশের পরেই ভ্রু কুঁচকে উঠে কপালে সেই ব্যবসায়ীর।

এরপর শহরের ডিআইটিতে রাজউকের জায়গায় অবস্থিত “সিটি পয়েন্ট” নামক প্রতিষ্ঠানের দোকান মালিক এ কে এম জগলুল হায়দার (মামুন) উক্ত দোকান ঘরের মাসিক ভাড়া প্রদান স্থগিত রেখে উচ্ছেদের শংকায় দ্রুত এব্যাপারে রাজউক কর্তৃপক্ষের সাথে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়ায়ে তাতে বিপত্তি বাঁধায় অবৈধ ভাবে দোকান ঘরটি নির্মান ভাড়া প্রদানকারী সংস্থা (রাজউক মার্কেট) ২ নং ডি.আই.টি মার্কেট ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা।

দোকান ঘরটির ভাড়া প্রদানের লক্ষ্যে রাজউকের সাথে সমঝোতা তো দূরের কথা, উপরন্তু একপর্যায়ে উক্ত সংগঠনটির নেতৃবৃন্দরা রাতের আঁধারে প্রায় ৪০/৪৫ জন বহিরাগত সন্ত্রাসী এনে “সিটি পয়েন্ট” এর মালিক মামুনের অবর্তমানে দোকানে থাকা তাঁর দু’জন কর্মচারীকে মারধর করে দোকানের ক্যাশে থাকা নগদ প্রায় পৌনে ৩ লাখ টাকা লুট করে দোকান ঘরটি তালাবদ্ধ করে দেয়।

ফলশ্রুতিতে, দোকানে রক্ষিত প্রায় ৪০ লাখ টাকা মূল্যমানের রেডিমেট পোশাক, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সংগৃহিত ঋণের কাগজপত্র, ব্যাংকের চেক বই, দোকান ভাড়ার মূল দলিলসহ বিভিন্ন কাগজপত্র উক্ত দোকানেই তালাবদ্ধ রয়ে যায়।

এরপর দোকান ঘরটি খুলে দিয়ে মালামালসহ আনুসাঙ্গিক কাগজপত্রাদি বুঝিয়ে দেয়ার জন্য উক্ত ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দদের কাছে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী “সিটি পয়েন্ট” এর মালিক এ কে এম জগলুল হায়দার মামুন বারংবার ধর্ণা দিলেও ব্যবসায়ী সংগঠনটির নেতৃবৃন্দরা তাতে কর্ণপাত না করে উল্টো মামুনের দোকানটির উপড় ২ নং ডি.আই.টি মার্কেট ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রধান কার্যালয়ের সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে দোকান ঘরটি তালাবদ্ধ করে রাখে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দরা।

তারপর প্রায় দীর্ঘ ৮ বছর যাবত রাজউকের জায়গায় নির্মিত অবৈধ দোকানটি ব্যাবসায়ী সংগঠনটি জোরপূর্বক দখল করে রাখায় বিভিন্ন ব্যাংক হতে নেয়া ঋণ নিয়মিত পরিশোধ করতে না পেরে কারাভোগও করতে হয়েছে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী মামুনকে। একপর্যায়ে ঋণের বোঝা কমাতে নিজের জমি-বাড়ী বিক্রি করে বর্তমানে রীতিমত সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। তন্মধ্যেই, মামুনের উপড় এখন আবার ‘মরার উপড় খাড়ার ঘাঁ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন হতে সম্প্রতি প্রাপ্ত তার দোকান ঘরটি উচ্ছেদের নোটিশ।

শেখ রাসেল পার্কে প্রবেশের সুবিদার্থে ডি.আই.টি রাজউক মার্কেট-১ ও ২ ভবনের এর মধ্যবর্তী স্থানে চলাচলের জন্য ২০ ফুট প্রস্থের রাস্তাটির উপড় অবৈধ ভাবে নির্মিত “সিটি পয়েন্ট” নামক দোকান ঘরটি উচ্ছেদের লক্ষ্যে নাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আবুল আমিন গত বছরের ২১ ডিসেম্বর “সিটি পয়েন্টের” মালিক জগলুল হায়দার মামুনকে দোকান ঘরের জায়গাটির মালিকানা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যোগাযোগের জন্য একটি পত্র প্রেরণ করেন।

এরপরই কোন উপায়ন্তর না পেয়ে সম্প্রতি সুবিচার প্রত্যাশায় মহামান্য আদালতের দ্বারস্থ হন ক্ষতিগ্রস্থ পোশাক ব্যবসায়ী “সিটি পয়েন্ট” এর মালিক জগলুল হায়দার মামুন (৫৪)। দীর্ঘ বছরে ক্ষতি হওয়া প্রায় ২ কোটি ১২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ, প্রাণনাশের হুমকি প্রদানসহ নানা অভিযোগ এনে ২ নং ডি.আই.টি মার্কেট ব্যবসায়ী সংগঠনের বর্তমান ও প্রাক্তন সভাপতি/সাধারন সম্পাদকসহ ৭ জনকে আসামী করে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আমলী (ক-অঞ্চল) আদালতে মামলা দায়ের করেন তিনি।

মামলার আসামীরা হলেন, ২নং ডি.আই.টি মার্কেট ব্যবসায়ী সংগঠনের (রাজউক মার্কেট-২) বর্তমান সভাপতি মো: শাহজাহান (৬৫), সদস্য ডা: আবুল কাশেম, সহ-সভাপতি ছিদ্দিকুর রহমান (৭০), সাবেক সভাপতি ডা: আর আহসান, প্রাক্তন ও বর্তমান সাধারন সম্পাদক (গিফট কর্ণারের মালিক) কামরুল হাসান (৫৫), সদস্য (মদিনা অপটিক্যালের মালিক) মো: কামাল হোসেন (৫৮), সদস্য ভেনাস সুজের মালিক) মো: জুয়েল (৫৫) ও কোষাধ্যক্ষ (সুন্দরী সুজের মালিক) শংকর সাহা (৬২)।
পরবর্তীতে আদালত মামলার আবেদনটি আমলে নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশকে নির্দেশ প্রদান করেছেন বলে জানিয়েছেন মামলাটির বাদীপক্ষের আইনজীবী জাকারিয়া হাবিব।

এরপর আদালতের নির্দেশে মামলাটি মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ইলিয়াছ হোসেন।
তিনি এব্যাপারে লাইভ নারায়ণগঞ্জকে জানান, ‘আদালতে বাদীর দায়েরকৃত অভিযোগের কপি হস্তগত হওয়ার পর মামলার তদন্ত কাজ শুরু করেছি। শীঘ্রই মামলাটির তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে দ্রুতই মামলার বাদী জগলুল হায়দার মামুনের সাথে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে সমঝোতা বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন, দোকানঘরটি ভাড়া প্রদানকারী ব্যবসায়ী সংগঠনটির তৎকালীন সভাপতি ডা: আর আহসান।

তিনি লাইভ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে মামুন ভাইয়ের মামলা দায়েরের বিষয়টি শুনেছি। তবে আমি অবগত ছিলাম না যে, মামুন ভাইয়ের দোকান ঘরটি তালাবদ্ধ করে ব্যবসায়ী সংগঠনের কার্যালয় বানানো হয়েছে। আমি প্রায় ১৩ বছর যাবত উক্ত সংগঠন থেকে অব্যাহতি নিয়েছি। তারপরেও যেহেতু এমন একটি ঘটনা ঘটেছে সেহেতু সংগঠনের বর্তমান নেতৃবৃন্দকে নিয়ে শীঘ্রই মামুন ভাইয়ের সাথে আলোচনায় বসা হবে।’

মামলার বাদী জগলুল হায়দার মামুন মামলায় উল্লেখ করেছেন, “জেলা-ঢাকা হালে নারায়ণগঞ্জ, ২নং ডিআইটি (রাজউক) মার্কেটস্থ উত্তর প্রান্তের দোকান ঘরটি যাহার নং ২/ক, যাহার উত্তরে-১ নং ডিআইটি মার্কেট, পশ্চিমে- রেলওয়ে কলোনী, পূর্বে- বিবি রোড, দক্ষিণে প্রাইম স্পোর্টস, এই চৌহুদ্দির মধ্যে অবস্থিত দোকান ঘরটি বিগত ২০০৩ইং সালের ১০ নভেম্বর ২নং ডিআইটি মার্কেট ব্যবসায়ী সংগঠন হতে বাৎসরিক ৭২ হাজার টাকা চুক্তিতে ভাড়া নিয়া ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন মামুন।”

“এরপর রাজউক কর্তৃপক্ষ মামুনকে রাজউকের নিকট দোকানঘরটির ভাড়া প্রদানের নির্দেশনা দিলে মামুন ব্যবসায়ীক সংগঠনটির নিকট ২০১০ সাল থেকে ভাড়া প্রদান করা থেকে বিরত থাকেন। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ৩০ আগষ্ট রাত ৮ টায় কোন নোটিশ প্রদান করেই ব্যবসায়ীক সংগঠনটির প্রাক্তন ও বর্তমান সাধারন সম্পাদক মো: কামরুল হাসান ৪০/৪৫ জন গুন্ডা প্রকৃতির লোকজন নিয়ে দোকানে(সিটি পেয়ন্ট) থাকা কর্মচারী উক্ত মামলার সাক্ষী দুলালসহ আরও কয়েকজন কর্মচারীকে হুমকি ভয়ভীতি দেখিয়ে দোকান থেকে বের করে দেন।”

“ফলশ্রুতিতে, সিটি পয়েন্ট নামক দোকানটিতে মামুনের রক্ষিত ৪০ লাখ টাকা মূল্যমানের মালামাল, দোকানঘরটি ভাড়ার মূলকপি ও ভাড়া রশিদসহ বিভিন্ন ব্যাংক হতে গৃহিত লোনের কাগজপত্র তালঅবদ্ধ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে মামুন বহুবার দোকানঘরটি খুলে দেয়ার অনুরোধ জানালেও ব্যাবসায়ী সংগঠনের তৎকালীন সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক নানা ধরনের টালবাহানা করে আর দোকানঘরটি খুলে দেয় নাই।”

মামুন জানান, “দোকানঘরটি বেআইনীভাবে বন্ধ করে দেয়ার কারনে ইস্টার্ন ব্যাংক হতে ৪০ লাখ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংক হতে ১০ লাখ টাকা, ওয়ান ব্যাংক হতে ৩ লাখ এবং ব্যাক্তিগত ভাবে উত্তোলিত ১৯ লাখ টাকা ঋণের টাকা তিনি যথাসময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় একপর্যায়ে তাকে যেমন জেল খাটতে হয়েছিল তেমনি ঋণের বোঝা কমাতে তাঁর মালিকানাধীন সিটি মেডিকেল হল নামক একটি দোকানঘর ও নগরীর গলাচিপা এলাকায় অবস্থিত ৪ শতাংশের একটি বাড়ী বিক্রি করতে হয়েছিল।”

তাই দীর্ঘ বছর যাবত সর্বস্বান্ত হয়ে এখন ২নং ডিআইটি মার্কেট ব্যবসায়ী সংগঠনের সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দদের বিচার দাবীতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী সিটি পয়েন্টের মালিক জগলুল হায়দার মামুন।

0