দূষণে ধুঁকছে শীতলক্ষ্যা, চাষের মাছেই না.গঞ্জে পুষ্টি পূরণ

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের মূল শহর ও বন্দরের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে শীতলক্ষ্যা নদী। সেই সঙ্গে এ জেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য নদী-নালা ও খাল-বিল। অথচ নারায়ণগঞ্জবাসীর খাবারের প্লেটে জোটে না দেশি মাছ। এখানকার মানুষের চাহিদা পূরণ হয়, অন্য জেলা আসা ও চাষ করা মাছে ।

সূত্র মতে, শীতলক্ষ্যা ধুকছে শিল্পদূষণে। কলকারখানার বর্জ্য ও বাসা বাড়ির ময়লা-আবর্জনা আর সুয়ারেজের নোংরা পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে এ নদী। ড্রেজার দিয়ে বালুভরাটের কারণে পুকুর, খাল-বিলসহ মৎস্য সম্পদের সব উৎস এখন চাপা পড়েছে। নদীর পাড়ঘেঁসে শোভা পাচ্ছে বাড়িঘর, দালান, শিল্পকারখানা আর দোকানপাট। ফলে বিলুপ্ত হচ্ছে মছের আবাসস্থল। তাছাড়া বর্ষার মৌসুম ছাড়া সারা বছর নদীর পানি পঁচে দূর্গন্ধ ছড়ায়, ফলে মারাত্নক হুমকির মুখে পড়েছে শহরের পরিবেশ।

বন্দর এলাকার বাসিন্দা রানা বলেন, প্রভাবশালীরদের কারণে শীতলক্ষ্যা নদীতে মাছতো নেই-ই, এমনকি পানিতে গোসলও করা যায় না। নদীতে নামলে শরীর চুলকায়, নানা রোগ দেখা দেয়।

শহরের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশির দশকে এই শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রচুর মাছ মিলতো। শহর ও বন্দরের জেলেরা বছরজুড়ে একাধিক বড় বড় বাঁশ পুঁতে বিশাল জাল (বেহাল জাল) দিয়ে মাছ ধরতো। সেই মাছ নগরীর বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হতো। তখন বড়শি ফেললেই মাছ মিলতো। শীতকালে যখন ক্ষেত-খামারের পানি শুকিয়ে যেত, তখন বিল ও নীচু জমিতে কচুরিপানা পরিষ্কার করে কাঁদাময় পানিতে মাছ ধরার ধুম পড়ত। দেশিয় মাছের সেই সোনালী দিন হারিয়ে গেছে।

সামেদ মিয়া নামে এক প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, আশির দশকে বর্ষা মৌসুমে খাল বিলে নতুন পানি আসতো। তখন মাছ ধরার ধুম পড়তো। দিন রাত মাছ ধরতাম। এসব কথা এখন গল্প হয়ে গেছে। কত তরতাজা মাছ খেয়েছি। এখন খাই চাষের মাছ। খালবিল না থাকায় দেশি মাছ মেলে না।

নগরীর ৩নং ঘাট এলাকার মাছ ব্যবসায়ী আলমঙ্গীর হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জের মাছঘাটে শহরের বিভিন্ন নদী ও খালের মাছ আসতো। এখন চোখেও দেখি না। নারায়ণগঞ্জের মানুষের ভরসা এখন চাষের মাছ। আগে শীতলক্ষ্যায় বড়শি দিয়ে অনেক মাছ ধরেছি। নদীতে সারের পানি পড়লে মাছ ধরে শেষ করতে পারতাম না। কিন্তু এখন ডাইংয়ের পঁচা পানির কারণে মাছ পাওয়া যায় না।

বন্দরের জেলেপাড়ার কয়েক জন ছেলের সাথে কথা হলে তারা বলেন, আগে এই শীতলক্ষ্যা নদীতে শুধু ইলিশ মাছ ছাড়া অন্য সব মাছই কম বেশি পাওয়া যেত। এখন শীতলক্ষ্যায় মাছ নেই। কলকারখানার বর্জ্য পড়ে নদীর পানি পঁচে গেছে। তাই মাছ উৎপাদন কমেছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আয়নাল হক বলেন, নারায়ণগঞ্জ শিল্পনগরী হওয়ায় শিল্পবর্জ্যে নদী-নালা-খাল- বিল দূষিত হচ্ছে। আগে ১২ মাসই নদীতে ভালো পানি থাকতো। বর্ষার কিছুটা সময় মোটা-মুটি ৫ মাস, শীতলক্ষার পানি ভালো থাকলেও বাকি সাত মাসই থাকে দূষিত। ফলে এ নদীর কয়েকটা অংশে মাছের পরিমান প্রায় শূন্যই থাকে। তবে একেবারেই যে মাছ নেই, তা না। বলা যায়, আগের তুলনায় নদীতে এখন মাছের পরিমাণ অনেক কম।

তিনি বলেন, শিল্পবর্জ্যের জন্য নদীতে বিষক্রিয়ার প্রভাব যেমন রয়েছে তেমন আবাসিক বর্জ্য ব্যবস্থাও পানি দূষনের বড় কারণ। বিভিন্ন এলাকার ড্রেনের লাইন সরাসরি নদীতে দেয়া হয়েছে। ফলে প্রতিদিনই প্রচুর পরিমান আবাসিক বর্জ্য নদীতে পড়ছে এবং পানি দূষণ করছে। বিভিন্ন শিল্প কারখানার মালিকরা ইটিপি স্থাপন করলেও সেটি ঠিকমতো চালায় না। আবার যারা চালায়, তারা এর মধ্যে সঠিক নিয়মে চুনের ব্যবহার করছে কিনা, এটা নিয়মিত মনিটরিং করা দরকার।

মো. আয়নাল হক বলেন, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংস্লিষ্ট সকল দপ্তরকে এক সাথে মিলে কাজ করতে হবে। আর তা হলেই নদী দূষণ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।