নতুন বউ থেকে ‘ভাষাসৈনিক’ নাগিনা জোহা

0

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ: ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণে হতাহত;  এমন খবরে উত্তেজিত নারায়ণগঞ্জের মানুষও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরবর্তী করণীয় কী? জানতে সন্ধ্যার দিকে বায়তুল আমান ভবনে লোকজন জড়ো হতে থাকে। খবর পেয়ে পুলিশ এ ভবনে হামলা করেন। দরজা ভেঙ্গে তুলে নিয়ে যান খান সাহেব ওসমান আলীকে।


ভাষা সৈনিক নাগিনা জোহা মৃত্যুর বছর খানেক পূর্বে একটি সংবাদপত্রকে নিজেই দিয়েছিলেন এমন তথ্যই। তুলে ধরেছিলেন ‘নব বধূ’ থেকে ‘ভাষা সৈনিক’ হয়ে উঠার ইতিহাসও।

১৯৩৫ সালে অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার কাশেম নগরের জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নাগিনা জোহা। ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদালয়ের অধীনে মেট্টিক পাশ করেন। বাবা আবুল হাসনাত ছিলেন সমাজ হিতৈষী ও কাশেম নগরের জমিদার। নাগিনা জোহার বড় চাচা আবুল কাশেমের ছেলে আবুল হাশিম ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের মুসলীম লীগের সেক্রেটারি ও এম.এল.এ। চাচাতো ভাই মাহবুব জাহেদী ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ছিলেন। ভাগ্নে পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট নেতা সৈয়দ মনসুর হাবিবুল্লাহ রাজ্যসভার স্পিকার ছিলেন। ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের সন্তান রাজনীতিবিদ একেএম শামসুজ্জোহার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন।

ঢাকার অতি সন্নিকটবর্তী হওয়ায় প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের ঢেউ এসে আছড়ে পড়তো নারায়ণগঞ্জে। আবার কিছু কিছু আন্দোলনের সূত্রপাত হতো নারায়ণগঞ্জ থেকে। তেমনই একটি আন্দোলন ছিল ৫২’র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন।

১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জ ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ছিলেন নাগিনা জোহার স্বামী একেএম শামসুজ্জোহা আর শ্বশুর তৎকালিন এমএলএ খান সাহেব ওসমান আলীর চাষাঢ়ার বাড়ি বায়তুল আমান ছিল সকল আন্দোলন সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু। সে সময় আন্দোলন সংগ্রামের দিক নির্দেশনামূলক সভাগুলি বায়তুল আমানেই অনুষ্ঠিত হতো।

নাগিনা জোহার ভাষ্য মতে, ফেব্রুয়ারীর প্রথম থেকেই এখানে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। খান সাহেব ওসমান আলী, শামসুজ্জোহা, মফিজউদ্দিন আহমেদ, শফি হোসেন খান, আজগর হোসেন ভূঁইয়া, বজলুর রহমান, সুলতান মাহমুদ মলিক, শামছুল হুদা, মোস্তফা সারোয়ারসহ আরো অনেকে এ কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হয়ে ঢাকার সাথে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য রাজপথে আন্দোলন করতে থাকেন। ৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকার ছাত্র ধর্মঘটের আহ্বানে নারায়ণগঞ্জের সমস্ত স্কুল কলেজে ধর্মঘট পালিত হয়। যদিও আমি তখন নববধূ। বাবার বাড়িতে ছোট বেলা থেকেই রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বড় হয়েছি, আবার শ্বশুর বাড়িতে এসেও সেই পরিবেশ। তাই আগত নেতকর্মীদের আপ্যায়ণ ও কিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নোট বা ড্রাফট করার দায়িত্ব ছিল আমার উপর। সামছুজ্জোহার কোন চিরকুট লোক মারফত যথাস্থানে পৌছে দেওয়ার দায়িত্বও ছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমার সাহায্য নেওয়া হতো। সে কারণে আমাদের বাড়ি বায়তুল আমান ছিল পুলিশী নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু।

নাগিনা জোহার সূত্র অনুযায়ি, ২১ ফেব্রুয়ারীর রাষ্ট্রভাষা দিবসকে সফল করতে নারায়ণগঞ্জের ছাত্র সমাজসহ আপামর জনতা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। হ্যান্ডবিল বিতরণ করা হয়, হাতে লিখা পোস্টার লিখে দেয়ালে দেয়ালে সাটানো হয়। ওইদিন নারায়ণগঞ্জের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। ঘরের চৌহদ্দি পেরিয়ে সেদিন নাগিনা জোহাসহ কিছু মহিলাও রাজপথের বিক্ষোভ মিছিলে শরীক হয়েছিল। রাজপথের মিছিলে সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মফিজউদ্দিন আহমেদ, আজগর হোসেন ভূঁইয়া, বজলুর রহমান, সুলতান মাহমুদ মলিক, শামছুল হুদা, মোস্তফা সারোয়ার, শফি হোসেন খাঁন, মমতাজ বেগম, মোস্তফা মনোয়ার, জানে আলম, আলমাছ আলী(বড়) প্রমুখ। বিকেলে রহমত উল্লাহ ক্লাবে জনসভা হয়। ঢাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণে হতাহতের খবরে নারায়ণগঞ্জের মানুষও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সন্ধ্যার পরবর্তী করণীয় কী? জানতে বায়তুল আমানে লোকজন জড়ো হতে থাকে। এদিকে নাগিনা জোহার স্বামী শামসুজ্জোহাকে গ্রেপ্তার করার জন্য কিছুদিন ধরেই ওৎ পেতে ছিল পুলিশ। জোহা সাহেবও এটা বুঝতে পেরে আত্মগোপনে থেকেই নেতাকর্মীদের আন্দোলন সংগ্রামের দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়।

নাগিনা জোহার মতে, ২১ ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় প্রচুর লোক মিটিং করছে, এ খবর পেয়ে পুলিশ বায়তুল আমানে হামলা করে। পুলিশ আমাদের বাসায় এসে জোহাকে খুঁজতে থাকে গ্রেপ্তারের জন্য। তখন বাসায় জড়ো হওয়া অনেক নেতাকর্মীরা যে যেভাবে পেরেছে, সটকে পড়েছে। একজন লোক আত্মরক্ষার জন্য গাছে উঠেছিল, তাকে সিপাহীরা টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়।

নাগিনা জোহা বলেছিলেন, আমাদের পরিবারের সবাই বিশেষ করে শিশুরা ভয়ে তটস্থ। সে এক বিভৎস অবস্থা। আমরা ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে বসে আছি। এমন সময় প্রচুর সিপাহী এসে দরজা খুলতে বললে আমরা খুলিনি। শ্বশুর সাহেবকেও বলেছিলাম উপরে চলে যেতে কিন্তু তিনি আমাকে একা ফেলে যাননি। যদিও নতুন বউ; তথাপি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে মনে সাহস সঞ্চয় করে পরিবারের সবাইকে ছাদে চলে যেতে বললাম। আমি ও আমার শ্বশুর ওসমান আলী সাহেব দুজনে দরজা আগলে রাখলাম। ওদিকে সিপাহীরা দরজায় বুট দিয়ে লাথি মেরে ভাঙার চেষ্টা করছিল। আমরা সেটাকে আগলে রাখার চেষ্টা করছিলাম। সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে, আমার হাতে স্বর্নের ও কাচের চুড়ি ছিল। দরজা যেন ভাঙতে না পারে তার জন্য শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজার উপর শরীর ও বাহু চেপে রেখেছিলাম। উল্টাদিক থেকে বুটের জোরালো লাথির আঘাতে আমার চুড়িগুলি হাতের মধ্যে বিধে গিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। একপর্যায়ে তারা দরজা ভাঙতে সক্ষম হয়।

নাগিনা জোহা আরও বলেন, ভিতরে ঢুকে সিপাহীরা সমস্ত বাড়ি তলাশি করে তছনছ করে খান সাহেব ওসমান আলীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। আমি একসময় উত্তেজিত হয়ে সিপাহীদের সাথে তর্কযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি। তারা আমাকেও গ্রেপ্তার করতে চাইলে এক বাঙালি সিপাহীর অনুরোধে রেখে যায়। পরে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমিও জোহার (স্বামী) সঙ্গে আত্মগোপনে চলে যাই। ৯ মাস আত্মগোপনে থেকে স্বামীকে নিয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে আত্মসমর্পণ করাই।

সেই সময় মিথ্যা মামলায় শামসুজ্জোহা সাহেবকে ১৮ মাস কারাবন্দী রাখা হয়।

নাগিনা জোহা বলেছিলেন, আমরা সত্যি গর্বিত জাতি। কেননা মায়ের ভাষার জন্য আর কোন জাতিকে আন্দোলন করতে হয়নি, প্রাণ দিতে হয়নি। আমাদের সে আন্দোলন সফল হয়েছিল; বিধায় আমরা বাংলায় ‘মা’ বলে ডাকতে পারি।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৭ মার্চ বাধ্যক জনিত কারণে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় নাগিনা জোহার। আজ সেই ভাষা সৈনিকের ৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী। যার স্বামী ছিলেন শামসুজ্জোহা ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সংসদ সদস্য। এছাড়া বড় ছেলে প্রয়াত নাসিম ওসমান জাতীয় পার্টির হয়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মেজ ছেলে বিকেএমইএর সভাপতি সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির এমপি। আর ছোট ছেলে শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য।

0