না.গঞ্জের ‘খেলা হবে’ পশ্চিমবঙ্গের ভোটে, মুখ খুললেন শামীম ওসমান

0

বাসুদেব ধর: বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ, আওয়ামি লিগ সাংসদ শামিম ওসমানের রাজনীতির ভাষা খেলা হবে। ছোট্ট এই দুটো শব্দ বাংলাদশে রাজনীতির ময়দানে বেপরোয়া মনোভাব প্রকাশ করে। একসময় তুমুলভাবে আলোচনায় আসে। এবার শামিম ওসমানের একান্ত নিজস্ব রাজনীতির এই ভাষাই এখন পশ্চিমবঙ্গে রফতানি হয়ে ভোটের রাজনীতিতে স্থান করে নিয়েছে। বিধানসভার নির্বাচন দুয়ারে কড়া নাড়ছে, এরই মধ্যে উত্তাল রাজনীতি। গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, ‘ভোট ময়দানে এখন তুলকালাম এই দুটি শব্দ। রাজ্যে ভোটের আগে বিজেপি, তৃণমূল, বাম, কংগ্রেস সব দলই অহরহ ব্যবহার করছে এই ‘খেলা হবে’, নানা রঙে ও নানা রূপে।

গত নির্বাচনী প্রচারণায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নাম না করেও (বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভাষায়) ‘শিরদাঁড়া ঠান্ডা করে দেওয়া হুমকি’র সুরেই শামিম ওসমান বলতেন, ‘খেলা হবে’। বলতেন, ‘কারে খেলা শেখান? আমরা তো ছোটবেলার খেলোয়াড়’। যে বক্তৃতার ভিডিও আজও ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে আছে।

এপারে বসে জানা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচন সামনে, বড়জোর মাস দুই আড়াই। ভোটের আগে সে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, নানা কারণে-অকারণে প্রতিপক্ষর উদ্দেশে হুঙ্কার দিচ্ছেন সব দলের নেতারাই। আর সেই পটভূমিতেই হঠাৎ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিবিদদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে শামিম ওসমানের সেই পুরনো শ্লোগান ‘খেলা হবে’।

গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, এখন পশ্চিমবঙ্গে ডাকসাইটে নেতারা সবাই কথায় কথায় হুমকি দিচ্ছেন ‘খেলা হবে’। এই শব্দ দুটোর সঙ্গে আগে-পরে নানা লাইন জুড়ে বাঁধা হচ্ছে রাজনৈতিক কবিতাও। মিছিলে ও পদযাত্রায় নিয়মিত শ্লোগান দেওয়া হচ্ছে ‘খেলা হবে’, কেউ কেউ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলছেন ‘ভয়ঙ্কর খেলা হবে’। চটুল সুরে গান বেঁধে রাজনৈতিক সমাবেশ-মিছিলে ‘খেলা হবে’ বাজাচ্ছেন ডিজের, এমন ঘটনাও ঘটছে পশ্চিমবঙ্গে।

ঠিক কীভাবে ‘খেলা হবে’ সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গ পাড়ি দিল তা পরিষ্কার নয়। তবে যতদূর জানা যাচ্ছে, গত ডিসেম্বরে মেদিনীপুরের আলোচিত নেতা শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করার পর নিজের খাসতালুক নন্দীগ্রামে প্রথম যে সভা করেছিলেন, সেখানেই তিনি ‘খেলা হবে’ শব্দ দুটো প্রথম ব্যবহার করেন। তারপরই ‘খেলা হবে’ লুফে নেন বীরভূম জেলার তৃণমূল নেতা অনুব্রত মন্ডল ওরফে কেষ্ট। দলের সভা সমাবেশ থেকে তিনি নিয়মিত হুঙ্কার দিতে থাকেন, ‘শুধু খেলা হবে না, ভয়ঙ্কর খেলা হবে’- ঠিক শামিম ওসমানের ঢঙেই।

এরপর থেকেই শুধু বিজেপি বা তৃণমূল নয়, পশ্চিমবঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের নেতারাই ‘খেলা হবে’ শ্লোগান দিতে শুরু করেছেন। বামপন্থী বা কংগ্রেসীরাও তাতে পিছিয়ে নেই। সম্প্রতি তার সঙ্গে যোগ হয়েছে মাইকে কান ফাটানো আওয়াজে ‘খেলা হবে’ গানের সঙ্গে উদ্দাম নাচ।

বর্ধমানের মঙ্গলকোটে রীতিমতো ডিজে দিয়ে ‘খেলা হবে’ গান বাজিয়ে তৃণমূল কর্মীরা উদ্দাম নেচেছেন, যেখানে ছিলেন অনু্ব্রত মন্ডলও। মেদিনীপুরের ঘাটালে তৃণমূল বিধায়ক শঙ্কর দলুইও অনুগামীদের সঙ্গে নিয়ে খেলা-খেলা-খেলা হবে গানের সঙ্গে কোমর দুলিয়েছেন, সে ছবিও নিমেষে ভাইরাল হয়েছে।

স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সম্প্রতি ডাক দিয়েছেন ‘হোক না একটা খেলা’। কুলপিতে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো ও যুব তৃণমুলের সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘মাঠে নেমে খেলবো’ বলেছেন।

তৃণমূলের এমপি, মুখপাত্র কাকলি ঘোষ দস্তিদারও নিজের ব্যাডমিন্টন খেলার একটি ছবি টুইট করে লিখেছেন, ‘খেলা হবে’। বলে বলে আউট হবে। টাইটটা যে পুরোপুরি রাজনৈতিক, পরিস্কার করে দিয়েছেন সেটাও।

ঢাকায় শামিম ওসমানের সঙ্গে এ ব্যাপারে দৈনিক স্টেটসম্যানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি শুনেছি। আসলে ২০১৩/১৪ সালে লাগাতার সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক উস্কানি এবং গণতান্ত্রিক ধারা ধ্বংস করার যড়ষন্ত্রের রাজনীতির বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণায় আমি এই শব্দ দুটো ব্যবহার করেছিলাম। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, জাতির পিতার ডাকে হানাদারদের রুখতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে জাতি। বন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় বাধা আসবে, এ কল্পনাও করতে পারি না। শব্দদুটি ব্যবহার করেছি একদিকে অঙ্গীকার, অন্যদিকে ক্রোধ থেকে।

শামিম ওসমানের মায়ের দেশ বর্ধমানে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে শামিম ওসমান বলেন, ভারত আমাদের দুর্দিনের বন্ধু। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন আমাদেরও আলোড়িত করে। আমরা সেদিকে তাকাই। পশ্চিমবঙ্গ নিকটতম পড়শি, একাত্তরের এই রাজ্যে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভারত এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র দিয়েছে। চুড়ান্ত পর্যায়ে ভারতের মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী এক সঙ্গে লড়াই করেছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। দুই রক্ত মিশে গেছে। এভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয়ে এসেছে। শামিম ওসমান বলেন, আমরা শব্দ দুটি সেখানে কীভাবে, কী প্রেক্ষাপটে ব্যব্হার হচ্ছে জানি না। আমার কোন মন্তব্য নেই। তবে, আসন্ন নির্বাচন অত্যন্ত সুন্দর ভাবে হোক এ কমনা করি। কোন হিংসাত্বক ঘটনা যেন না ঘটে, কারণ আমরা তো সেই দিকে তাকাই। [সূত্র: কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক স্টেটসম্যান]

0