পাটের অবৈধ মজুতে বাড়ছে দাম, কমছে রপ্তানি

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে পাটের মজুত করায় দেশে পাটের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে রাষ্ট্র রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে রপ্তানিও কমে যাচ্ছে। তাই পাট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সব ব্যবসায়ীর জন্য কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে পাট মজুত করার অশুভ তৎপরতা ঠেকানো যাবে। পাটশিল্প খাতের চারটি ব্যবসায়িক সংগঠন এমন দাবি জানিয়েছে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে মঙ্গলবার দুপুরে এক মতবিনিময় সভায় এসব সংগঠনের নেতারা মজুতদারদের হাত থেকে পাট খাত রক্ষায় তাঁদের দাবি তুলে ধরেন। সংগঠন চারটি হলো বাংলাদেশ পাটকল সমিতি (বিজেএমএ), বাংলাদেশ পাট স্পিনার্স সমিতি (বিজেএসএ), বাংলাদেশ পাট সমিতি (বিজেএ) ও বাংলাদেশ পাটপণ্য রপ্তানিকারক সমিতি (বিজেজিইএ)। মতিঝিলের আদমজীকোর্ট ভবনে বিজেএমএর সভাকক্ষে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

মতবিনিময় সভায় মিলমালিক ও পাট ব্যবসায়ীরা মজুতদারদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ আইনের সঠিক প্রয়োগ, কাঁচা পাটের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ, পাটজাত পণ্যে মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং পাট উৎপাদনের সঠিক তথ্য সংরক্ষণসহ কয়েকটি দাবি জানান।

সভায় বিজেএসএ ও আকিজ গ্রুপের চেয়ারম্যান শেখ নাসির উদ্দিন বলেন, সাধারণত পাটচাষিদের কাছ থেকে ব্যাপারীরা কাঁচা পাট কিনে থাকেন। আর ব্যাপারীদের কাছ থেকে সেই পাট কিনে নেন মিলমালিকেরা কিংবা রপ্তানিকারকেরা। কিন্তু এর মাঝে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সরাসরি কৃষক ও ব্যাপারীদের কাছ থেকে পাট কিনে নিয়ে মজুত করে রাখে। তিনি বলেন, মিলমালিক ও রপ্তানিকারকদের টিআইএন থাকলেও ব্যাপারী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কোনো নিবন্ধন নেই। তাই টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে অসাধু ব্যবসায়ীদের সহজে চিহ্নিত করা যাবে। এর মাধ্যমে পাটের অবৈধ মজুতও বন্ধ করা সম্ভব হবে।

মজুতের পরিমাণ নিয়ে শেখ নাসির উদ্দিন বলেন, ভারতে ১৫ টনের বেশি পাট পেলে রাষ্ট্র তা জব্দ করে নেয়। কিছুদিন আগেও পশ্চিম বাংলায় এ রকম ৮০০ টন পাট জব্দ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে মজুতের নিয়ম আছে ৪০ টনের মতো। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি কাঁচাপাট মজুত করে রাখে। কিন্তু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তা ঠিকভাবে তদারকি করা হয় না।

পাট খাত রক্ষায় দেশে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই দাবি করে বিজেএসএর চেয়ারম্যান বলেন, পাট থেকে ১০০ টাকা আয় হলে তার পুরোটাই দেশে থেকে যায়। আর এ আয়ের ৮০ শতাংশ যায় কৃষকের হাতে। কিন্তু মজুতদারদের কারণে কৃষক, প্রকৃত ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্র—তিন পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পাট–বাণিজ্যে ‘দুর্নীতির ভূত’ আছে উল্লেখ করে শেখ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে আমরা বলতাম পশ্চিম পাকিস্তান আমাদের পাট নিয়ে সেখানে উন্নয়ন করছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে পাটের মজুত ও অবৈধ রপ্তানি করছে কারা? এই “ভূত” যদি না তাড়াতে পারি, তাহলে এই শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।’

সভার শুরুতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিজেএমএর চেয়ারম্যান মো. আবুল হোসেন। তিনি বলেন, কিছু অসাধু মুনাফালোভী কাঁচা পাট ব্যবসায়ী কম দামে কাঁচা পাট কিনে তা অবৈধভাবে মজুত করে পাটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। এতে কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে একদিকে মিলমালিকদের অত্যধিক মূল্যে কাঁচা পাট কিনে পাটপণ্য তৈরি করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে চড়া দাম থাকলেও কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

পাটের অবৈধ মজুতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জানিয়ে আবুল হোসেন বলেন, রপ্তানিমূল্যের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় রপ্তানি বাজার ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে। দাম বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা পাটের ক্রেতারাও বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। তাই কাঁচা পাটের মূল্য না কমালে মিলগুলো ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। আর ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকেরাও পাট উৎপাদনে আগ্রহ হারাবেন। এ জন্য পাটের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করাসহ অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ থেকে অবৈধ চোরাচালানের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশে পাট পাচার হচ্ছে জানিয়ে বিজেএমএর চেয়ারম্যান বর্তমান পরিস্থিতিতে পাটের সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধানের মতো এলাকা অনুযায়ী পাটের উৎপাদন পরিমাপের পরামর্শ দেন।

মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিজেএসএর সাধারণ সম্পাদক প্রণব চক্রবর্তী, বিজেএর চেয়ারম্যান শেখ সৈয়দ আলী ও জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান আরজু রহমান ভূঁইয়া এবং বিজেজিইএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম ও ভাইস চেয়ারম্যান দারা-আল-মাসুদ খান।