বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ, হয়নি কদম রসুল সেতু

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৫ নম্বর খেয়াঘাট দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর বহুল আকাঙ্খিত কদম রসুল সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে মূল শহরের সঙ্গে বন্দর এলাকাকে সংযুক্ত করতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল।

গত ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর একনেকের সভায় ৫৯০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে কদম রসুল সেতু অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যে মূল সেতুর জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৪৩০ কোটি টাকা। বাকি ১৬০ কোটি টাকা ব্যয় হবে জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য খরচে। পাঁচ নম্বর ঘাট থেকে বন্দরের একরামপুর হয়ে ১৩৮৫ মিটার দীর্ঘ হবে এই সেতু। যার মূল ব্রীজ ৩০০ মিটার ও এপ্রোচ রোড হবে ৩.৫০ কিলোমিটার।

এদিকে, শুধুমাত্র জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ। প্রকল্পটির কাজের বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ বা প্রায় ৩ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতিও প্রায় ৩ শতাংশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু নির্দেশনা দিয়ে প্রকল্পটির মেয়াদ ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই আরও তিন বছর বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশন।

আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটিতে সম্পূর্ণ অর্থায়ন সরকারের। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। এ প্রকল্পটির নকশা তৈরির কাজে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যৌথভাবে কাজ করেছে কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান ডনসাং ইঞ্জিনিয়ারিং, সয়েল অ্যান্ড ফাউন্ডেশন লিমিটেড ও বাংলাদেশ অ্যান্ড ডিএম ইঞ্জিনিয়ারিং। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের পর হঠাৎ করে নকশা পরিবর্তন করায় এ প্রতিষ্ঠানগুলো আরও অর্থ দাবি করে। তা দিতে রাজি হয়নি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।

কিন্তু সেতুটি নির্মাণের জন্য আসল কাজটি শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। সেটা হলো জমি অধিগ্রহণ জটিলতাই নিরসন করতে পারেনি। কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইএমইডি ও পরিকল্পনা কমিশনের পরামর্শ হলো ওই দুটি পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে জটিলতা দূর করা।

জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবদুল আজিজ বলেন, কুমুদিনী ওয়েফেয়ার ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি অধিগ্রহণ করতেই সময় চলে গেছে। সেতুটির নকশা প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান নকশা পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেছে। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও সময়ক্ষেপণের আরেকটি বড় কারণ। সেতুটির দিকে মুখিয়ে আছেন স্থানীয় লোকজন। এটি বাস্তবায়িত না হলে খেয়া পারাপারের সেই আদিম অবস্থানেই থাকতে হচ্ছে দুই পাড়ের মানুষদের।

প্রকল্পটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর ‘কদম রসুল সেতু’ প্রকল্প ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পাস হয়। এর মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫৯০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে মূল সেতুর জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৪৩০ কোটি টাকা। বাকি ১৬০ কোটি টাকা জমি অধিগ্রহণসহ আনুষঙ্গিক খরচ নির্বাহ হবে।

প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে, শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সদরের পাঁচ নম্বর ঘাট থেকে বন্দরের একরামপুরের ইস্পাহানি ঘাট পর্যন্ত ১ হাজার ৩৮৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে এই সেতু হবে। মূল সেতুর দুই পাশে ফুটপাত থাকবে। সেতুর প্রস্থ হবে ১২ দশমিক ৫ মিটার।

আইএমইডি প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করে বলেছে, প্রকল্প পরিচালকের দেওয়া কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের সব অসমাপ্ত কার্যক্রম ২০২৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করতে হবে। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল সুপারিশ করা মেয়াদের পর আর কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না। ব্যয়ও বাড়ানো যাবে না।

কয়েকটি সুপারিশের মধ্যে আরও রয়েছে, যেহেতু তারের ঝুলন্ত সেতু এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রথম, তাই সেতু নির্মাণের সংশোধিত নকশা ও প্রাক্কলন প্রস্তুত করে এতে স্থানীয় এলজিইডির অনুমোদন নিতে হবে। সেটা পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডিতে জানাতে হবে।

অবশ্য আইএমইডি বলছে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সভা করতে হবে। জমি ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয়ে কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে আলাদাভাবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি।

তবে প্রকল্পটির কাজের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে আইএমইডি বলছে, প্রকল্পের মে ২০২২ সালের মে মাস পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি ১৬ কোটি ৬৮ লাখ বা ২ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ যা অতিবাহিত সময়ের তুলনায় খুবই কম। প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ যাতে আর না বাড়ে সেজন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা সংস্থা বা প্রকল্প দপ্তরের মনিটরিং বাড়ানোর জন্য জোর দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতের জন্য প্রকল্পের অনুকূলে অর্থবছরভিত্তিক অডিট সম্পাদনা আইএমইডিকে অবহিত করতে হবে বলে জানানো হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, বর্ধিত সময়ের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করে সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। প্রকল্পের মেয়াদ ও আর্থিক খরচ যাতে আর না বাড়ে সেজন্য প্রকল্প দপ্তরের মনিটরিং বাড়াতে হবে। জমি ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয়ে দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিকল্পনা কমিশনকে জানাতে হবে।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-৫ সংসদীয় আসন সদর ও বন্দর উপজেলা নিয়ে গঠিত। প্রায় ১০ লাখ লোকের বসবাস শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড়ে। প্রতিদিন কয়েক লাখ বন্দরবাসীকে অনেকটা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই খেয়া পারাপার হয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে আসতে হচ্ছে।

স্থানীয় লোকজন জানান, শীতলক্ষ্যা নদীর সেন্ট্রাল ফেরিঘাট, পাঁচ নম্বর খেয়াঘাট, স্কুলঘাট, নবীগঞ্জঘাট, মাছুয়া বাজারঘাট, বরফকল ঘাটসহ কয়েকটি ঘাট দিয়ে যাত্রীরা পারাপার হচ্ছেন। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শীতলক্ষ্যা নদীতে সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও গত ৩০ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি।

খেয়া যাত্রীরা অভিযোগ করেন, সেতু না থাকার সুযোগ নিয়ে ইজারাদার ও নৌকার মাঝিরা তাদের হয়রানি করেন। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাঝি ও ইজারাদাররা।