রূপগঞ্জ ট্র্যাজেডি: বেঁচেও যেন মৃত জীবন সবিতার

0

মো.শাহেল মাহমুদ, রূপগঞ্জ করেসপন্ডেন্ট: আমার একমাত্র মাইয়া সবিতা রানী দাস (২৫)। টেহার লাইগা চিকিৎসা করাইতে পারিনা। কয়েকটা ব্যাথার টেবলেট খাওয়াইয়া ঘরের মধ্যে শুয়াইয়া রাখছি। কোন কিছু খাইতে পারেনা। সারাক্ষণ মাথা ব্যাথা, কোমড় আর হাঁটু ব্যাথায় কান্দে। আমি গরীব মানুষ, মাইয়াডার চিকিৎসা করামু কেমনে ? আমার মাইয়াডা বাইচাও মরার মতই পইরা আছে। কথা গুলো বলছিলেন রূপগঞ্জের সেজান জুস কারখানার আগুনে পুড়া ভবনের ৩য় তলা থেকে লাফিয়ে বেচেঁ ফেরা সবিতার মা সফলা রাণী সরকার। কথা বলার সময় বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পরেন তিনি। চোখে মুখে ভাসছিল আফসোস আর হতাশার প্রতিচ্ছ্ববি। সবিতা রাণী সরকার সিলেটের সুরমা এলাকার মুক্তিযোদ্ধা সারদা সরকারের মেয়ে।সবিতার মা সফলা রাণী বলেন, প্রায় আট বছর আগে মেয়ে সবিতাকে সিলেটের সুরমা এলাকার নয়ন দাসের সাথে বিয়ে দেয়া হয়। তাদের দাম্পত্য জীবনে পরপর দু’টি সন্তান জন্ম নিলেও অসুস্থতার কারণে মারা যায় সন্তান দু’টি। পরে তয় বারের মত সন্তান জন্ম দেন সবিতা রাণী। ততদিনের গোপনে সুখের খুঁজে অন্যত্র সংসার বাধেঁন স্বামী নয়ন দাস। আর তয় সন্তান শ্রাবন্তী রাণী দাসের জন্মের পরেই পালিয়ে যায় তার স্বামী। স্বামীর অবর্তমানে সংসারে হানা দেয় দারিদ্রতা-কষ্ট আর দুর্ভোগ।

পরিবারের দারিদ্রতা দূর করতে গত পাচঁ বছর ধরে রোলিং মিল, গার্মেন্টসহ বিভিন্ন কারখানায় কাজ করেন সবিতা। প্রায় ছয়মাস আগে কাজ নেয় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার সজীব গ্রুপের হাশেম ফুড লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সেজান জুস কারাখানায়। অন্যান্য দিনের মতই গত ৮ জুলাই বৃহস্পতিবার সকালে কাজে যায় সবিতা। বিকাল ৫টার দিকে কর্মস্থলে ৬তলা ভবনের ৩য় তলায় আগুন লাগে। প্রাণে বাচঁতে ছুটোছুটি করে মেইন গেইটে যায় সবিতা। সেখানে তালাবদ্ধ দেখে পুনরায় ৩য় তলায় উঠে সে। একপর্যায়ে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পরলে প্রাণে বাচঁতে ৩য় তলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পরে সবিতাসহ ২৫/৩০ জন। লাফ দেয়ার পরে আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয় স্থানীরা।

হাসপাতালে নেয়ার পর সবিতার পরিক্ষা-নিরিক্ষার পর তার মাথা, কোমড়, হাঁটু ও গোড়ালিতে সমস্যা হয়েছে, চিকিৎসার জন্য মোটা অংকের টাকার প্রয়োজন বলে জানায় চিকিৎসকরা। হাসপাতালে ভর্তি করার পর সামান্য কিছু ব্যান্ডেস, ব্যাথার টেবলেট দিয়ে আর কোন খোঁজ খবর নেয়নি কেউ। এমন অবস্থা দেখে মেয়েকে বাসায় নিয়ে আসে তার মা ও পরিবার।

সবিতার মা বলেন, আমরা গরীব মানুষ। দিন আনি দিন খাই। প্রথম কয়েকদিন টাকার অভাবে সবিতার চিকিৎসা প্রায়ই বন্ধ হয়ে যায়। পরে সরকারের দেয়া পঞ্চাশ হাজার টাকা পেয়ে পুনরায় চলছে তার চিকিৎসা কার্যক্রম। তিনি বলেন, এই পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে সবিতা আগের মত সুস্থ হতে পারবে তো ?

সবিতার বাবা সারদা দাস বলেন, আমার মেয়ে সামান্য বেতনে কাজ করে। অভাবের সংসার আর ভাড়া বাসার খরচ, শিশুর খাবারসহ প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে প্রতিমাসেই হিমশিম খেতে হয়। তার মধ্যে এখনো কারকানায় ২ মাসের ওভারটাইম বকেয়া জমা আছে ।

স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পরে গ্রাম ছেড়ে নারায়ণগঞ্জ চলে আসেন সবিতা ও তার পুরো পরিবার। বাসা ভাড়া নেয় রূপগঞ্জ উপজেলার বরপা-মাশাবো এলাকায়। সেখানে মেয়ে বাবাসহ পুরো পরিবার নিয়ে ভালই কাটছিল তাদের সংসার।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ্ নুসরাত জাহান বলেন, আগুনের ঘটনায় আহত ও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে আমরা সবসময় যোগাযোগ করছি। কোন প্রকার সমস্যা হলেই সমাধান করা হবে। তাদের অনুদান প্রদান অব্যাহত আছে।

0