আঁতাতের রাজনীতির গোমর ফাঁস!

লাইভ নারায়ণগঞ্জ: বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলার আহ্বায়ক তৈমূর আলম খন্দকারের একটি বিম্ফোরক মন্তব্য নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝড় উঠেছে। এতেদিন বদ্ধ ঘরে যে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের ঢালপালা মেলেছে সেটিই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন এক সময়ের আইভী ঘনিষ্ঠ এই নেতা। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত সিটি মেয়র আইভীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার দয়া না করলে মেয়র হতে পারতেন না। অথচ সেই নেত্রীর জন্য শহীদ মিনারে অনশন করতে দেন না’। তার এ বক্তব্য সোমবার টক অব দ্যা টাউন ছিলো। এর আগে বিএনপির আরেক নেতা মহানগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেছিলেন, ‘প্রিয় নেত্রীকে কে বা কারা ভূল বুঝিয়েছে। সেই কারণে তৈমূর আলম খন্দকারকে নির্বাচনের পূর্ব রাতে বসিয়ে দেওয়া হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে শামীম ওসমানকে ঠেকাতে বিএনপির বিরাট অংশ ও বিএনপির ভোটারা আইভীকে ভোট দিয়ে দেয়’।

জানা গেছে, ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর দেশের প্রথম নারী মেয়র হয়েছিলেন সেলিনা হায়াত আইভী। সেই নির্বাচনের মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে বিএনপি-জামায়াত তথা চারদলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকারকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিলো। বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধাণমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থণ প্রত্যাহারের কারণেই তৈমূর প্রতিদ্ধন্ধিতা থেকে দূরে সরে যান। এর পেছনে অনেক কারণ আলোচনায় থাকলেও সবচে মুখ্য কারণ ছিলো গোপন আঁতাত। মেয়র পদে অধিষ্ঠিত হতে মায়ের পেট থেকে জয় বাংলা শ্লোগান শোনার দাবিদার সেলিনা হায়াত আইভী আঁতাত করেছিলেন বিএনপি-জামায়াতের সাথে। মেয়র হওয়ার জন্য কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাথে। মুলত খালেদা জিয়ার সমর্থণেই মেয়র হয়েছিলেন আইভী। এতোদিন ধরে এনিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও আইভী, বিএনপি-জামায়াত কেউ ই মুখ খোলেননি। অবশেষে ঐ নির্বাচনে গোসল ছাড়া কোরবানী হওয়া বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার নিজেই মুখ খুললেন।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে কেন্দ্রীয় কর্মসূচীর অংশ হিসেবে চাষাড়া শহীদ মিনারে গণঅনশন করতে চেয়েছিলো জেলা বিএনপি। কিন্তু অনুমতি দেননি মেয়র আইভী। অবশেষে শহরের মাসদাইর এলাকার মজলুম মিলনায়তনে কর্মসূচি পালন করতে হয়েছে। যা নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

গণ অনশনে সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, আমরা এই গণ অনশনটি এখানে না করে অন্য জায়গায় করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোথাও অনুমতি পাইনি। সবশেষ চেয়েছিলাম শহীদ মিনারে করতে। কিন্তু সেখানেও করতে দেয়া হয়নি। যার দয়ায় সিটি কর্পোরেশনের মেয়র (ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী) সেই নেত্রীর জন্য শহীদ মিনারে অনশন করা যায় না। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দয়া না করলে হয়তো আজ মেয়র হতে পারতেন না। কিন্তু সেই খালেদার জিয়ার অনুষ্ঠান শহীদ মিনারে করা যায় না।

আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা জানায়, তৈমূর আলমের বক্তব্যের পর বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে মেয়র আইভীর গোপন আঁতাত নিয়ে এতেদিন যে আলোচনা চলছিলো তা সত্যে পরিণত হলো। স্বার্থের জন্য সে (আইভী) আওয়ামীলীগ করে। স্বার্থের ব্যঘাত ঘটলে আবার পল্টিও মারেন। এই হলো তার রাজনীতি। দলের দুঃসময়ে, দেশের দূর্যোগে তিনি মানুষের পাশে থাকেন না। মেয়র পদের জন্য যে যুদ্ধাপরাধী, দেশদ্রেহী জামায়াত-বিএনপির সাথে গোপন আঁতাত করতে পারে তার কাছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বলতে কিছু নেই। সে হচ্ছে স্বার্থপর। স্বার্থের জন্যই বলেন, বঙ্গবন্ধুর কর্মী, শেখ হাসিনার কর্মী, আবার স্বার্থ ফুরালে যোগ দেন দেশদ্রোহীদের দলে।

এদিকে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, ‘বাবার পরিচয় ও বিএনপির একটি অংশের সমর্থনে আজকের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী। আমার ৩৮ বছরের রাজনৈতিক জীবনে উনাকে কখনো দেখিনি, আওয়ামী লীগের ব্যানারে কোন আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। তারপরেও এখন আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দেন। বাবার পরিচয়েই ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তখন বিএনপির একটি অংশ আইভীর পক্ষে গোপনে কাজ করে, বেঈমানী করে আমাদের তৎকালিন পৌরসভার চেয়ারম্যান প্রার্থী নুরুল ইসলাম সরদারকে হারিয়ে দিয়েছে। বিএনপির একটি অংশ পরবর্তিতেও আইভীর পক্ষে কাজ করেছে এবং আইভীকে ভোট দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ২০১১ তে যখন নির্বাচন হলো। তখন শামীম ওসমান, আইভী এবং তৈমূর আলম খন্দকার প্রার্থী ছিলেন। তখনও আমার প্রাণ প্রিয় নেত্রীকে কে বা কারা ভূল বুঝিয়েছে, ‘তৈমূর আলম খন্দকারকে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে থাকলে শামীম ওসমান মেয়র হয়ে যাবে’। সেই কারণে তৈমূর আলম খন্দকারকে নির্বাচনের পূর্ব রাতে বসিয়ে দেওয়া হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতে শামীম ওসমানকে ঠেকাতে বিএনপির বিরাট অংশ ও বিএনপির ভোটারা আইভীকে ভোট দিয়ে দেয়।

আবু আল ইউসুফ খান টিপু  বলেন, ‘২০১৬ সালে যে নির্বাচনেও বিএনপির একটি অংশ আইভীর হয়ে গোপনে কাজ করেছে। তাই বিএনপির অনেক নেতাকর্মী ও অনেক বিএনপির কাউন্সিলররা সে সময় আইভীর পক্ষে ভোট দিয়েছে।’

আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা দাবি করছেন, ‘মেয়র আইভী বরাবরই সরকার বিরোধীদের সাথে নিয়ে চলেন। জামাত-বিএনপি-বাম ঘরোনাসহ আওয়ামী লীগের শত্রু, এই সরকার বিরোধীরাই আইভীর শক্তি’।